মোস্তাফিজ চৌধুরী: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে বেসরকারি চিকিৎসা সেবা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রয়েছে অসুস্থ প্রতিযোগিতা। অতিরিক্ত ব্যবসা ও মুনাফার লোভে প্রতিষ্ঠানের মার্কেটিং এর নামে দীর্ঘদিন যাবত চলছে কমিশন বাণিজ্য। স্বাস্থ্যসেবা প্রার্থীদের দ্বিগুণ খরচে নিতে হচ্ছে সেবা,চাপিয়ে দেয়া হচ্ছে অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা ও নামি বেনামি ঔষধ।
সাধারণভাবে মার্কেটিং হল কোন পণ্য, ব্যবসা,সেবা ,অথবা ব্র্যান্ডের প্রচার ও প্রসার এর কাজে ব্যবহার করার একটি প্রক্রিয়া। মার্কেটিং এর আসল উদ্দেশ্য হলো জনসাধারণের কাছে নির্দিষ্ট পণ্য, ব্যবসা ,সেবা অথবা ব্রান্ডের ডিমান্ড বা ভ্যালু বৃদ্ধি করা। কিন্তু বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলো তাদের দেয়া চিকিৎসা সেবার প্রচার ও প্রসারের বদলে মার্কেটিং এর নামে চালিয়ে যাচ্ছে কমিশন বাণিজ্য। জেলা শহরের প্রত্যেকটি বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের রয়েছে নিয়োগকৃত একাধিক মার্কেটিং অফিসার। তারা জেলার প্রত্যেকটি উপজেলার পাড়া,মহল্লা,গ্রাম ও হাটবাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা ঔষধের দোকানদার,পল্লী চিকিৎসক ও স্থানীয় প্রভাবশালীদের সাথে রোগী প্রতি ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ কমিশন প্রদানের শর্তে মৌখিকভাবে চুক্তিবদ্ধ হয়। যার ফলে সাধারণ সেবা প্রার্থীদের স্বাস্থ্য সেবা নিতে দ্বিগুণ পরিমাণ অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
“জড়িপ ও অনুসন্ধান বলছে, শুধুমাত্র কমিশন বাণিজ্যের কারনে পাড়া মহল্লার ঔষুধ বিক্রেতা, বীমা কর্মী, কতিপয় স্বেচ্ছাসেবক, সংগঠক, কথিত সাংবাদিকরাও হয়ে যাচ্ছেন এসব হাসপাতালের মার্কেটিং অংশিদার। তারা রোগী সংশ্লিষ্ট হাসপাতালে পাঠালেই মাস শেষে পাচ্ছেন নির্ধারিত অংকের কমিশন। এতে সাধারণ গরীব রোগী ও স্বজনদের কাছে বাড়ছে চিকিৎসা ব্যয়।”
শুধু তাই নয়, ওই কমিশন ভোগীদের কমিশন দিতে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের নির্দেশে ডাক্তাররাও রোগীর কাছ থেকে নিচ্ছেন অতিরিক্ত টাকা। প্রয়োজন না হলেও পরীক্ষা নিরীক্ষা দিচ্ছেন বেশি। এতে সংশ্লিষ্ট ডাক্তারও পাচ্ছেন কমিশন। আবার রোগী পরীক্ষণ যন্ত্রের রেডিয়েশনের প্রভাবে আরও জটিল রোগে আক্রান্ত হচ্ছেন প্রতিনিয়ত।
আবার এক শ্রেণির নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত অর্থলোভী চিকিৎসক বিভিন্ন প্রাইভেট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও প্যাথলজিক্যাল ল্যাবরেটরির সঙ্গে গোপন চুক্তিতে রোগীর পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর কমিশন গ্রহণ করছে। অভিযোগ রয়েছে, কমিশনের লোভে বিপুল সংখ্যক চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয় পরীক্ষা নিরীক্ষাও করাচ্ছেন। এমনকি নিজের পছন্দের প্রতিষ্ঠান থেকে পরীক্ষা নিরীক্ষা করিয়ে আনতে বাধ্য করছেন তারা।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সরকারি হাসপাতালে এক্সরেসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি বিকল হয়ে পড়ে থাকার নেপথ্যেও রয়েছে কমিশন বাণিজ্য। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় স্বাস্থ্য সেক্টরে কমিশন বাণিজ্যের বিষয়টি ওপেন সিক্রেট হলেও এটি বন্ধে স্বাস্থ্য অধিদফতর কিংবা জেলা প্রশাসনের কার্যকর কোনো পদক্ষেপই নেই। নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক প্রাইভেট ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতালের শীর্ষ কর্মকর্তা জানিয়েছেন, ডাক্তারদের কমিশন বাণিজ্যের কারণে রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। কমিশন না পেলে চিকিৎসকরা রোগীকে অন্য জায়গায় পাঠিয়ে দেয়ার ভয়ে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে নিরুপায় হয়ে কমিশন দিতে বাধ্য হচ্ছেন। আর এ কমিশন বাণিজ্য বন্ধ করা গেলে চিকিৎসা ব্যয় অর্ধেকে নামিয়ে আনা সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
সূত্রমতে, জেলার এক শ্রেণির অসাধু ডাক্তারের কমিশন বাণিজ্যের কারণে চিকিৎসা ব্যয় বাড়ছে। দেশের প্রচলিত স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় ডাক্তাররা কোন ধরনের রোগীকে কী রোগের জন্য কী পরীক্ষা-নিরীক্ষা দিচ্ছেন, এ পরীক্ষার আদৌ প্রয়োজন রয়েছে কী না তা দেখতে অডিট ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় এক শ্রেণির চিকিৎসক এমন দুঃসাহস দেখাচ্ছেন। এক্ষেত্রে গণমাধ্যম কর্মীরা সতর্ক দৃষ্টি রেখে অনুসন্ধানী প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে কমিশন ব্যবসা বন্ধে গুরত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারতো৷ কিন্তু দেখা গেছে এসব ডাক্তাররা যেসকল প্রাইভেট ক্লিনিকে বসেন সেখানে কোন কোন সাংবাদিক উপদেষ্টা হয়ে কিংবা হাসপাতালের অংশীদার হয়ে বসে আছেন।
সূত্র বলছে, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর শতকরা ২০ থেকে ৩০ ভাগ কমিশন প্রদান করেন। এসব কমিশন যিনি ওই হাসপাতালে পাঠান তাকে দেয়া হয়। আর ডাক্তারদেরও থাকে এমন অংকের কমিশন বাণিজ্য। ফলে এসব কমিশন অংক বন্ধ হলে চিকিৎসা ব্যয় বহুলাংশে হ্রাস করা সম্ভব হতো।
শহরে চিকিৎসা সেবার নামে ভবনে ভবনে গড়ে ওঠেছে প্রাইভেট হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার। অল্প দূরত্বে প্রায় অর্ধশত হাসপাতাল,ডায়াগনস্টিক সেন্টার থাকায় এসব হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ মার্কেটিং কাজে নিয়োজিত রেখেছে পাড়া মহল্লার ঔষুধ বিক্রেতাদের। কেউ কেউ স্বেচ্ছাসেবক ও সংগঠকদের রেখেছে কমিশন বাণিজ্যের আঁওতায়৷ এসব মার্কেটিং কাজে নিয়োজিতদের কমিশন দিতে গিয়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ বাড়িয়ে দিচ্ছেন চিকিৎসা ব্যয়। এমনকি স্বেচ্ছায় দান করা রক্ত যোদ্ধাদেরও কমিশনের লোভ দেখিয়ে কতিপয় হাসপাতালের মালিক পক্ষ তাদের মার্কেটিং কাজে নিয়োগ করেছে।
এমনকি চিহ্নিত দালালরাও কোন না কোন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মার্কেটিং অফিসার। দীর্ঘদিনের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে দাপিয়ে বেড়ানো দালালদের মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন মনিপুর-দত্তখলার জাকির হোসেন, মোবারক, জালাল মিয়া, জাকির, ছোটন মিয়া,মুসলিম, শাহপরান, রোকেয়া বেগম, সালমা বেগম, শিল্পী বেগম, মুক্তা বেগম-১, মুক্তা বেগম-২, স্বর্ণা বেগম, নার্গিস বেগম, রাণি বিশ্বাস,জাবেদ মিয়া, শিপন, আলম, জুয়েল, দুধ মিয়া, আছিয়া বেগম, শাকিল, মামুন, মাসুম, হুমায়ূন, আব্দুল্লাহ বকশি,ফয়সাল, রাসেল,আরশ, বশির, সাথি, মায়ারানী, যুথি ও জেনী।
এমনকি অভিযোগ রয়েছে এই দালালদের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য হারুন মিয়া নামক এক দালাল গেইটে সব সময় পাহারা দেয়। হাসপাতালে অভিযানের বিষয়ে জানতে পারলেই সে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে দালালদেরকে সর্তক করে দেয়।
জানা গেছে , এসব দালালদের প্রতিদিন হাত খরচের টাকা দেয় বেশ কয়েকটি বেসরকারি ক্লিনিকের মালিক। ভ্রাম্যমাণ আদালতে কোনো দালালের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ড হলেও ওইসব ক্লিনিক এসবের ব্যয় ভার বহন করে। দালালরা কারাগারে গেলে তাদের পরিবারকে ভরণপোষনের জন্য টাকা দেয়া হয় তাদের পক্ষ থেকে। এমনিক চিকিৎসক যখন কোনো রোগীকে টেস্ট করানোর কথা বলেন, তখন দালালরা সেই টেস্টগুলো করানোর জন্য ক্লিনিকগুলো থেকে কমিশন পেয়ে থাকে। পরীক্ষার টেস্ট অনুযায়ী শতকরা ৪৫-৫০ ভাগ পেয়ে থাকেন দালালরা। কিন্তু আল্ট্রাসনোগ্রাফি ও ডিজিটাল এক্স-রে থেকে তাদের কমিশনের ভাগ কম। তাই তারা চিকিৎসকদেরকে বেশী করে পরীক্ষা-নিরীক্ষা দেওয়ার জন্য অনুরোধ করেন। তাদের অনুরোধে চিকিৎসকরা অনেক সময় অপ্রয়োজনী কিছু টেস্ট করার জন্যও বলেন রোগীকে এমন অভিযোগও রয়েছে।
ভুক্তভোগীরা জানান, প্রতিদিন হাসপাতালে বিভিন্ন বয়সের নারী ও পুরুষ মিলে ৭০ থেকে ৮০ জন দালাল কাজ করে,পরিচয় জিজ্ঞেস করলে বলে তারা হাসপাতালের মার্কেটিং অফিসার। তারা রোগীদের সাথে ভাব জমিয়ে তাদেরকে বিভিন্ন প্রাইভেট ক্লিনিকে নিয়ে যায়। এর বিনিময়ে তারা প্রাইভেট ক্লিনিক থেকে পায় মোটা অংকের কমিশন। হাসপাতালের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীর বেশ কয়েকজন কর্মচারীও এই দালালীর সাথে জড়িত। বিশেষ করে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালে আউটসোর্সিং এর মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ডাক্তারের এসিস্ট্যান্টরা প্রায় প্রত্যেকেই কোন না কোন প্রাইভেট ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মার্কেটিং অফিসার।
এসব বিষয়ে বিশিষ্ট জনদের অভিমত, যখন কোন ব্যক্তির রোগ হয় তখন নানা কারনে রোগী ও স্বজনরা অসহায় হয়ে পড়েন। প্রথমে স্থানীয় ঔষধ বিক্রেতার কাছে পরামর্শ চান৷ এ সময় ঔষধ বিক্রেতা যে হাসপাতাল থেকে কমিশন সুবিধা পান, ওই হাসপাতালে যেতে পরামর্শ দেন৷ এ সময় হাসপাতালগুলো সংশ্লিষ্ট রোগী প্রেরকের কোটায় সিএম লিখে রেফার্ড চিহ্ন রেখে দেয়। এভাবে মাস শেষে কমিশন পাঠিয়ে দেয়া হয় রেফার্ডকারীকে৷
সচেতন মহলের অভিমত, রোগীদের বিপদের সময় তাদের কাছ থেকে কৌশলে অর্থ আদায় এটা নিছক প্রতারনা, অমানবিক কাজ। গরীবের রক্তচোষা এমন অপকর্মে লিপ্তরা কখনো নিজেকে মানবিক পরিচয় দিতে পারেন না। তাদের দাবী, স্বাস্থ্য অধিদপ্তর এবং জেলা প্রশাসনের কঠোর নজরদারী থাকলে এসব সমস্যা দূর করে চিকিৎসা ব্যয় কমানোসহ নিরাপদ পরিবেশ বজায় রাখতে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেত।
চলবে…
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics