মোস্তাফিজ চৌধুরী: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা শহরে চিকিৎসা সেবার নামে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ব্যাপক লাভজনক ও জনপ্রিয় হয়ে ওঠেছে। সেসকল প্রতিষ্ঠানে স্বাস্থ্যসেবার নামে প্রতিনিয়ত চলছে সেবা প্রার্থীকে হয়রানি, ভুল চিকিৎসা, অতিরিক্ত ফি আদায়, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে সেবা দেয়া,চটকদার বিজ্ঞাপন এবং দালালের রোষানলে ফেলে সর্বস্ব হাতিয়ে নেয়ার প্রতিযোগিতা। কিন্তু এই নৈরাজ্য রুখতে নেয়া হচ্ছে না সঠিক ব্যবস্থা, প্রতিনিয়ত করা হচ্ছে না তদারকি। তাই জনস্বার্থে প্রত্যেকটি হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নৈরাজ্য নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ করার অভিপ্রায় রাখছি আমরা। আজকে শহরে প্রায় একযুগ ধরে চলা হলি ল্যাব হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, প্রায় অর্ধযুগ ধরে চলা আল খলিল হাসপাতাল ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, এবং প্রায় অর্ধ বছর যাবত ধরে চলা দ্যা মেঘনা জেনারেল হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের নৈরাজ্য তুলে ধরার চেষ্টা করা হয়েছে।
হলি ল্যাব হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার:
সম্প্রতি হলি ল্যাবকে অব্যবস্থাপনা, অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ, মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ, উন্মুক্ত স্থানে মেডিকেল বর্জ্য ফেলে রাখার অভিযোগে এক লাখ টাকা জরিমানা করে ভ্রাম্যমাণ আদালত।
সরেজমিনে কুমারশীল মোড়ে অবস্থিত হলি ল্যাব হাসপাতালে গেলে ঢুকতেই দমবন্ধ হওয়া অবস্থায় পড়তে হয়, প্রবেশপথে বিশাল জেনারেটর সংকীর্ণ প্রবেশদ্বারকে আরও সংকীর্ণ করে ফেলেছে, শব্দদূষণ বাড়িয়েছে জেনারেটরের বিকট আওয়াজ। সেবাপ্রার্থী অনেকের সাথে কথা বলে জানা যায়, ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের ছয়জন নিয়মিত ডাক্তারদের এনে বিভিন্নভাবে চলছে চিকিৎসা সেবাকে ঘিরে কমিশন বাণিজ্য। সরকার দলীয় রাজনীতির সাথে জড়িত থাকায় হাসপাতালের মালিক ও পরিচালক আবু কাওসার দেখাচ্ছেন স্বেচ্ছাচারিতা, এবং জেলা ড্রাগিস্ট এন্ড কেমিস্ট সমিতির সেক্রেটারি হিসেবে জেলার স্বাস্থ্য খাতে দেখাচ্ছেন আলাদা প্রভাব,এমনকি জেলা শহরের ফার্মেসিতে ঔষধ বিক্রিতে ছাড় না দিতে দোকানদারদের বাধ্য করার পিছনে অন্যতম কুশীলব যুবলীগ নেতা আবু কাওসার। কোন ফার্মেসি তথা ঔষধের দোকানে ছাড় দিয়ে ঔষধ বিক্রি করলে সাধারণ দোকানদারদের পড়তে হচ্ছে তার এবং তার অনুসারীদের রোষানলে, এমনকি নেয়া হচ্ছে জরিমানাসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা। এতেই প্রতীয়মান হয় অতিরিক্ত মুনাফার জন্য তাদের অতিরিক্ত লোভ।
হলি ল্যাব হাসপাতালের ডাঃ শ্যামল রঞ্জন দেবনাথ করোনা পজিটিভ হয়েও জনসাধারণের স্বাস্থ্য ঝুঁকির বিষয়টি বিবেচ্য না রেখে অতিরিক্ত মুনাফার লোভে চিকিৎসা সেবা চালু রাখেন, অত:পর হাসপাতাল মালিক ও পরিচালক আবু কাওসার, তার স্ত্রী এবং শ্যালক করোনা আক্রান্ত হওয়া নিয়ে জেলা জুড়ে ব্যাপক ক্ষোভ ও অসন্তোষের প্রকাশ পায়। প্রশ্ন উঠে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ এবং ডাক্তারের পেশাদারিত্ব নিয়ে, সমালোচনা উঠে তাদের অতিরিক্ত মুনাফা লাভের লোভ নিয়ে।
হলি ল্যাব হাসপাতালের মালিক ও পরিচালক যুবলীগ নেতা আবু কাওসার এর সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, প্রায় ১২ বছর যাবত আমার হাসপাতাল চলতেছে,কোন দিন মেয়াদ উত্তীর্ণ ঔষধ এর ঘটনা ঘটেনি। জানিনা কে বা কারা এগুলো রেখে কোন ষড়যন্ত্র করেছে কিনা।
আল খলিল হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার:
আল খলিলের আন্ডারগ্রাউন্ডে ডায়াগনস্টিক ও ক্লিনিক নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। শুক্রবারে অতিরিক্ত রোগীর চাপে দমবন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হয়। স্বাস্থ্যসেবা নিতে আসা রোগীদের পড়তে হচ্ছে অক্সিজেন সংকটে।
সম্প্রতি এ হাসপাতালে একজন শিশু ও একজন কলেজ ছাত্রের চিকিৎসাকালীল মৃত্যুতে অভিযোগ ওঠেছে ভুল ও অপচিকিৎসার,হয়েছে মামলাও। অভিযোগ আছে টেবিলের নিচ দিয়ে বিভিন্ন ভুল ও অপচিকিৎসার সমঝোতারও। বিভ্রান্তি ও সমালোচনা আছে সম্প্রতি আল খলিল হাসপাতাল থেকে দ্যা মেঘনা হাসপাতালে চলে যাওয়া শিশু ও নবজাতকদের চিকিৎসক ডাঃ তৈয়বুর রহমানের ভুল ও অপচিকিৎসা নিয়ে। যার কারণে বিভিন্ন ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে আল খলিল ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে। এছাড়াও ২০২১ সালে এক অন্তঃসত্ত্বা নারীকে অর্ধেক অস্ত্রোপচার করে ফেলে চলে যায় আল খলিল হাসপাতাল এন্ড ডায়াগনস্টিক সেন্টারের এক চিকিৎসক। পরে সেদিন সন্ধ্যার দিকে ওই প্রসূতিকে পুলিশের হস্তক্ষেপে ঢাকায় পাঠানো হয়।
২৫০ শয্যা বিশিষ্ট ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেনারেল হাসপাতালের জুনিয়ার কনসালটেন্ট (হৃদরোগ) মোঃ মনির হোসেনের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে জনমনে। অধিকাংশের অভিমত অতিরিক্ত মুনাফার লোভে বেশিরভাগ ডাক্তারই নীতি নৈতিকতা বিবর্জিত আচরণ করে যাচ্ছে।
এব্যাপারে ডাক্তার মোঃ মনির হোসেনের মুঠোফোন নম্বরে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলে তিনি ফোনটি কেটে দেন।
আল খলিল হাসপাতালের চেয়ারম্যান খলিল বশির মানিকের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি দাবি করেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের প্রথম ১০ টি হাসপাতালের একটি তার হাসপাতাল। তিনি বলেন আন্ডারগ্রাউন্ডে ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক দেয়ায় কোন সমস্যা নেই, শেখ হাসিনা বার্ন ইউনিটেও আন্ডারগ্রাউন্ডে ৫ টি কক্ষে স্বাস্থ্যসেবা দেয়া হচ্ছে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কলেজ ছাত্রের মৃত্যুর ব্যাপারে কোন মন্তব্য করেননি।
তবে ৯ মাসের শিশু মৃত্যুর ঘটনায় ডাঃ তৈয়বকে হাসপাতাল ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, এরকম কিছুই না। ডাঃ তৈয়ব ইমম্যাচিউর,সে হুট করে চেম্বারে আসা বন্ধ করে দিয়ে একদিন ফোনে জানায় হাসপাতালে আর বসবে না। যেহেতু আমি তাকে ছোট ভাই এর মতো দেখি তাই তার কথা মেনে নেই।
ডাঃ তৈয়বের অন্য কোন বদভ্যাস আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সে একটু ইমম্যাচিউর,অল্পতেই রেগে যায়। এছাড়া অন্যকিছু আমার জানা নেই।
দি মেঘনা জেনারেল হাসপাতাল এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টার:
মাত্র প্রায় ছয় মাস হয়েছে মেঘনা হাসপাতালের পথচলার। কিন্তু তাদের কর্মকান্ডেই প্রতীয়মান হয় চিকিৎসা সেবার চেয়ে তাদের আগ্রহ বেশি অতিরিক্ত মুনাফায়। মেঘনা হাসপাতালে সবচেয়ে বেশি রোগী যাচ্ছে ডাঃ মোঃ আমান উল্লাহ আমান এবং ডাঃ তৈয়বুর রহমানকে দেখাতে। বলা হয়ে থাকে জেলা জুড়ে এদুজনের মার্কেটিং তথা দালালের প্রসার অনেক বেশি। হাসপাতালের সামনে ডাঃ মোঃ আমান উল্লাহ আমানের যে ব্যানার টাঙানো আছে সেখানে উনার বিএমডিসি রেজিঃ নং দেয়া ৯৫৬৪৮,কিন্তু যাচাই করে দেখা যায় এটি ডাঃ আমানের রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার নয়, এটি ডাঃ শাহনাজ সাথী নামের একজনের রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার।
এব্যাপারে এবং হাসপাতালের সার্বিক বিষয়ে জানতে সরেজমিনে দি মেঘনা হাসপাতালে গেলে সেখানে দায়িত্বরত ম্যানেজার বলেন, এ হাসপাতাল শহর যুবলীগ সভাপতি আমজাদ হোসেন রনি’র,আপনারা তো তাকে চিনেনই। তার সাথে যোগাযোগ করেন। আমজাদ হোসেন রনি’র সাথে যোগাযোগ করলে তিনি পরদিন সকালে সাংবাদিকতার লাইসেন্স নিয়ে দেখা করতে বলেন।
তাছাড়া মেঘনা হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা দেয়া বিতর্কিত ডাঃ তৈয়ব,ডাঃ পরশউল্লাহ, ডাঃ শিবানী দেব এর ব্যানারে কিংবা চেম্বারের সামনে বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার উল্লেখ নেই। যদিও রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার উল্লেখ রাখা অনেক আগেই বাধ্যতামূলক করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর।
প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে ডাঃ তৈয়ব এর বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন নাম্বার (৬৯৫৯৭) যাচাই করে দেখা যায় প্রায় চারবছর আগে সেটি মেয়াদোত্তীর্ণ হয়ে গেছে, কিন্তু তিনি সেটি রিনিউ করেননি।
ভুল ও অপচিকিৎসার অভিযোগে আদালতে মামলা দায়ের হওয়াসহ বিভিন্ন বিতর্ক থাকার পরও কেন বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন নবায়ন করেননি জানতে চাইলে ডাঃ তৈয়ব বলেন, আমি একজন এমবিবিএস ডাক্তার, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে এটাই যথেষ্ট। বিএমডিসি রেজিষ্ট্রেশন আছে কিনা সেটা মানুষের দেখার দরকার নাই। এটা সিভিল সার্জন ও স্বাস্থ্য অধিদপ্তর দেখবে।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, হলি ল্যাব, আল খলিল, এবং দি মেঘনা হাসপাতালের স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেয়া লাইসেন্স থাকলেও ১৯৮২ সালের অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী অধিকাংশ মানদণ্ডই পূরণ করা হয়নি। সাধারণ ওয়ার্ডে পর্যাপ্ত ভেন্টিলেশন, আলো বাতাসের ব্যবস্থা ও দক্ষ ডিপ্লোমা নার্স নাই। এমতাবস্থায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ স্বেচ্ছাচারী আচরণ করেই টিকে রয়েছে। নিয়ন্ত্রণে আনার প্রক্রিয়ায় কুলিয়ে উঠতে পারছেনা প্রশাসন।
স্বাস্থ্য সচেতন ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের অভিমত সরকারি হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটারে আধুনিক যন্ত্রপাতি থাকলেও চিকিৎসকেরা উপস্হিত থাকেন না। তারা সময় দিয়ে থাকেন স্হানীয় কোন ক্লিনিকে। চিকিৎসকেরা নিজেদের স্বার্থে হাসপাতালের আধুনিক পরিবেশ ছেড়ে স্হানীয় এমন ক্লিনিকেও যান যেখানে হারিকেনের আলোয় অস্ত্রোপচার করা হয় বলা চলে। আবার সরকারি চাকুরে যে সকল ডাক্তার ও স্বাস্হ্য সহকারি হাসপাতাল মালিক বনে গেছেন তারা তাদের সরকারি কর্মস্হলে প্রায়ই উপস্হিত থাকেন না । কর্মস্হলে এলেও এক থেকে দেড় ঘণ্টার বেশি সময় দেন না । তারা বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য নিয়ে ব্যস্ত থাকেন । কোন আইনকানুনের তোয়াক্কা তারা করেন না । বছরের পর বছর তারা আইনের প্রতি বুড়ো আঙুল দেখিয়ে চলেন । এগুলো দেখার যেন কেউ নেই ।
অনেক প্রাইভেট ক্লিনিক উন্নত সেবা দেয়ার নামে বাণিজ্যিকীকরণের পথে চলে। তাই স্বাস্হ্যসেবার মান বাড়ে না । তবে ক্লিনিক মালিকদের বিলাসি জীবন যাত্রার মান বাড়ে, কিন্তু স্বাস্হ্যব্যবস্হা ‘মোটাতাজা’ হয়না । প্রাইভেট হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর জবাবদিহিতা, মেডিক্যাল অডিট কোন কিছুরই স্বচ্ছতা নেই। স্হানীয় ক্লিনিকগুলো দরিদ্র নারী ও শিশুদের পুষ্টিহীনতা নিয়ে কোন কাজ করে বলে কেউ জানে না। জনগন এমন ক্লিনিক সেবা চায় না, যারা গর্ভবতীকে প্রসব না করিয়ে অপ্রয়োজনে সিজার চালিয়ে দেয়। সরকারের পাশাপাশি বেসরকারি খাতের স্বাস্হ্যসেবা কেন্দ্রগুলোকেও দরিদ্র জনগোষ্ঠীর বিশেষ করে দিনমজুর ও অন্যান্য শ্রমজীবী মানুষের স্বাস্হ্যগত সমস্যার দেখভালের নিশ্চয়তা দিতে হবে। ছোট শহর ও গ্রামের মানুষগুলোর হাসি-কান্না, সুখ-দুঃখের সাথী হবে তারা এমনটা আশা করে, বেশি কিছু নয়। অন্যদিকে ক্লিনিকগুলো থেকে পাওয়া চিকিৎসা সঠিক কিনা, সেটুকু জানার অধিকারও মানুষের রয়েছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার স্বাস্হ্যখাত পেন্ডুলামের মতো অবিরাম দুলতে থাকুক তেমনটা আমরা কেউই চাই না ।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics