Tepantor

মালিক সমিতির মাধ্যমে প্রতি সিএনজি’তে ৪০ নেয় ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ

20 September, 2023 : 3:07 pm

মোস্তাফিজ চৌধুরী: মোটা অঙ্কের টাকা না দিলে সিএনজি অটোরিক্সা সহ যেকোন যানবাহনের রেজিস্ট্রেশন করেনা ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ। এই প্রথা যেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ অফিসে ওপেন সিক্রেট। কোন সিএনজি অটোরিক্সার মালিক রেজিস্ট্রেশন করতে বিআরটিএ অফিসে গেলে তারা রেজিস্ট্রেশন না করে ওই মালিককে মালিক সমিতির কাছে যাওয়ার আদেশ দেন। পরে মালিক সমিতির মাধ্যমে এই ঘুষ গ্রহন করে বিআরটিএ। যদিও বিআরটিএ অফিস প্রধান এসব অভিযোগ নাকচ করেছেন। তিনি মালিক সমিতির পক্ষে সাফাই গেয়ে বলেছেন, “সারা দেশে বিআরটিএ অফিসে যেভাবে কাজ হয় আমরাও সেভাবেই করি”।

সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির কিছু অসাধু ব্যক্তি সিএনজি রেজিষ্ট্রেশন করতে অনৈতিকভাবে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা করে নিচ্ছে। এবং রেজিষ্ট্রেশনের পর ডিজিটাল নাম্বার প্লেট বিতরণের সময় বিআরটিএ’র মনোনীত ব্যক্তি ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ নেয়।

জানা যায়, বেশ কিছু দিন বন্ধ থাকার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সিএনজি অটোরিক্সা রেজিষ্ট্রেশন চালু করেছে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ), ব্রাহ্মণবাড়িয়া। প্রায় দুইমাস আগে রেজিষ্ট্রেশন ফি এবং নাম্বার প্লেট ফি জমা দেয়া সিএনজির ডিজিটাল নাম্বার প্লেট গত ১২ ও ১৩ সেপ্টেম্বর মঙ্গল ও বুধবার দেওয়া হয়। বিতরণ কালে সিএনজি মালিক ও ড্রাইভারদের কাছ থেকে অনৈতিকভাবে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে নিয়েছে বিআরটিএ’র লোক। এরকমটি জানার পর বুধবার দুপুরে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের নিচতলায় অবস্থিত বিআরটিএ অফিস এবং এর আশে পাশের এলাকায় তেপান্তরের পক্ষ থেকে অনুসন্ধান চালানো হয়। অনুসন্ধানে গাড়ি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সিএনজি মালিকদের কাছ থেকে ৪০ থেকে ৪২ হাজার টাকা এবং ডিজিটাল নেমপ্লেট এর জন্য ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা ঘুষ নেওয়ায় তথ্য রেকর্ড করা হয়। জাবেদ নামের টাইগার আইটির এক ব্যাক্তি (যিনি বিআরটিএ কর্তৃক মনোনীত)  সিএনজির মালিক ও ড্রাইভারদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে ৫০০ টাকা করে ঘুষ নিয়ে নাম্বার প্লেট বিতরণ করছে যার ভিডিও ফুটেজ পাওয়া যায়। প্রতিবেদক ঘটনাস্থলে পৌছার আগ পর্যন্ত প্রায় ৭৫ জন ব্যক্তির কাছ থেকে জাভেদ ঘুষ নিয়েছে বলে তথ্য পাওয়া যায়। এই বিষয়ে জানতে সহকারী পরিচালকের রুমে গেলে তাকে অনুপস্থিত পাওয়া যায়। মোটরযান পরিদর্শকের রুমে যেয়ে সহকারী পরিচালকের ব্যাপারে এবং সিএনজি রেজিষ্ট্রেশনের অনিয়ম ও দুর্নীতির ব্যাপারে জানতে চাইলে দায়িত্বরত মহসিন মিয়া জানান সহকারী পরিচালক ছুটিতে আছেন, এব্যাপারে তিনি বক্তব্য দিতে পারেননা। তিনি প্রতিবেদককে পরের সপ্তাহে অফিসে আসতে বলেন।

গত রোববার ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক ইঞ্জিনিয়ার আবু আশরাফ সিদ্দিকীর সাথে তার অফিসে দেখা করলে তিনি বলেন,  জাবেদ আমাদের লোক নয়,সে টাইগার আইটির লোক। তার কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছি,তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

সে দু’দিনে প্রায় ৩০০ জন সিএনজি মালিক ও ড্রাইভারদের কাছ থেকে প্রায় দেড় লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে, সে বাহির থেকে এসে আপনাদের প্রশ্রয় ছাড়া এরকম দুর্নীতি করার সাহস করতে পারে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, মানুষজনের প্রচুর ভীড় থাকলে কেউ কেউ সুযোগ নেয়ার চেষ্টা করে। দু’দিনে ১০০ জন করে ২০০ জনকে নাম্বার প্লেট নিতে মুঠোফোনে এসএমএস করলেও এসএমএস ছাড়াই শত শত লোক ভীড় করাই সে এ সুযোগটা নিয়েছে।

এসএমএস ছাড়াও টাকা নিয়ে অন্যদের কেন নাম্বার দেয়া হল জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দিতে পারেননি।

সিএনজি রেজিষ্ট্রেশনের জন্য মালিক সমিতির কাছে কেন যেতে হয়,এবং সাধারণ মালিকরা সরাসরি কেন আপনাদের মাধ্যমে রেজিষ্ট্রেশন করেনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিএনজি রেজিস্ট্রেশনের জন্য সরাসরি আবেদনের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু সিএনজি মালিকরাই সরাসরি আসেনা। কারণ ওদের একটা সংগঠন আছে।

তারপর ইঞ্জিনিয়ার আবু আশরাফ সিএনজি মালিক সমিতির পক্ষে বলেন, মনে করেন যে আমাদের একটা সংগঠন আছে, আপনি আমাদের সংগঠনের সদস্য। আপনি চাইলে কিন্তু অন্যভাবে সরাসরি আসতে পারবেন না। সিএনজির সকল মালিকই সিএনজি মালিক সমিতির সদস্য এবং তারা চাই যে ঐভাবে আসতে। আমরা ওপেন করে দিয়েছি, বলে দিয়েছি কাউকে পাচ টাকা দিবেন না। যদি কেউ নেয় সরাসরি তার দায়ভার আমরা নিব। এখন কোন সদস্য সমিতিকে ডিঙ্গাইয়া  আসবেনা, যদি যায় তবে আমার গাড়িটার যদি কোন সমস্যা হয় অথবা রাস্তায় কোনো বিপদ হয় তাহলে সমিতি এগিয়ে আসবে না।

ইঞ্জিনিয়ার আশরাফের বক্তব্যে বিব্রতবোধ করে উনি বিআরটিএ’র সহকারী পরিচালক হিসেবেই কথা বলছেন নাকি সিএনজি অটোরিকশা মালিক সমিতির নেতা হিসেবে কথা বলছেন প্রতিবেদক জানতে চাইলে তিনি কোন উত্তর দেননি।

লাইসেন্স ইস্যুর সময় বা সিএনজি রেজিষ্ট্রেশনের সময় গাড়ির মালিকরা ছাড়া বারবার মালিক সমিতির লোক আসতেছে কেন? এব্যাপারে সমিতিকে প্রশ্নবিদ্ধ কেন করা হয় না? বিভিন্ন নামে এক ব্যক্তি শতাধিক লাইসেন্স কিভাবে ইস্যু করায়? এবং তারা প্রশ্রয় দেন বলেই মালিক সমিতি সবার উপর এটা অন্যায়ভাবে চাপিয়ে দিতে পারছে কিনা জানতে চাইলে ইঞ্জিনিয়ার আবু আশরাফ বলেন, সারা বাংলাদেশে এরকম হয়ে আসছে, এখানে আমাদের কিছুই করার নেই।

অনুসন্ধানে জানা যায়, গত তিন মাসে প্রায় ১৭০০ সিএনজি অটোরিকশা রেজিষ্ট্রেশন করা হয়েছে, যার জন্য সিএনজি মালিকদের গড়ে ৪০ হাজার টাকা করে মোট প্রায় ৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা খোয়াতে হয়েছে। আর সিএনজি মালিকদের কাছ থেকে এ টাকা সংগ্রহ করেছে জেলা সিএনজি মালিক সমিতির বিভিন্ন নেতা ও তাদের নির্ধারিত এজেন্টরা। অথচ সরকারিভাবে সিএনজি রেজিষ্ট্রেশন ফি, ট্রেজারি চালান, রেভিনিউ স্ট্যাম্প এবং বীমার ফি মিলিয়ে প্রায় ১৭ হাজার টাকা খরচ। সেক্ষেত্রে তারা প্রায় ২ কোটি ২১ লাখ টাকা অবৈধভাবে হাতিয়ে নিয়েছে।

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array