কাজী আশরাফুল ইসলাম: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহর ও এর আশেপাশের এলাকায় রিকশা ভাড়া গত ৬ মাসের ব্যবধানে বৃদ্ধি পেয়ে প্রায় দ্বিগুন হয়েছে। রিকশা ভাড়ার আকস্মিক বৃদ্ধিতে সাধারণ যাত্রীদের মনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধিতে এমনিতেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাভিশ্বাস চরমে। এরমধ্যে আবার রিকশা ভাড়ার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মেনে নিতে পারছে না শহরের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে স্বল্প দুরত্বের যাত্রীরা পড়েছেন বিপাকে। শহরের বিভিন্ন জায়গায় প্রতিদিনই রিকশা ভাড়া নিয়ে চালক ও যাত্রীদের মধ্যে কথা কাটাকাটিসহ অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। যদিও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে পৌরসভার পক্ষ থেকে পুরো শহরের রিকশা ভাড়া নির্ধারণ করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ ঐ সাইনবোর্ড টানিয়েই দায় সেরেছে।
তালিকানুযায়ী রিক্সা চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে কি-না,এ ব্যপারে নেই কোন তদারকি। তালিকা অনুযায়ী বিরাসার বাসস্ট্যান্ড থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত রিকশা ভাড়া হবার কথা ৩৫ টাকা, কিন্তু রিকশা চালকরা সেই ভারা সর্বনিম্ন ৬০ টাকার নিচে যেতে চান না। তালিকায় ট্যাংকেরপাড় মোড় থেকে সদর হাসপাতাল পর্যন্ত রিকশা ভাড়া হবার কথা ১০ টাকা কিন্তু রিকশা চালকদের দাবি ২০ টাকার নিচে শহরে কোন রিকশাভাড়া নেই অর্থাৎ রিক্সায় চড়লেই ২০টাকা ভাড়া। টেংকেরপাড় গেইটের সামনে কথা হয় রিকশা চালক বাচ্চু মিয়ার সাথে। পৌরসভার ভাড়ার তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন ,” পৌরসভার কারণেই তো ভাড়া বেশি নেওন লাগে। পৌরসভা লাইসেন্স যহন ছাড়ে তখন এক হাজার ট্যাহার লাইসেন্স পাইতে গেলে খরচ হয় দশ থেকে পনেরো হাজার ট্যাহা।যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া বাড়াইয়া না নিলে অতলা ট্যাহা জমামু কেমনে? ” শহরের কাউতলী মোড়ের রিকশা চালক নয়ন মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন ,” দশ হাজার টাকা লইয়্যা দুই মাস ঘুইরা লাইসেন্স না পাইয়া অহন আরেকজনের লাইসেন্স ডেইলি ১৫০ টাকা রোজে ভাড়া লইছি। পৌরসভার তালিকা মানা কেমনে সম্ভব!” শহরের মেড্ডা বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ফুলবাড়িয়ার ভাড়াটিয়া রিকশা চালক মিলন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন,” আমার বাড়ি মমিসিং।আমি ভাদাইম্মা ব্যাডারেতো পৌরসভা লাইসেন্স দিতো না। লাইসেন্স ছাড়াই মাঝেমধ্যে শহরে রিকশা লইয়্যা ঢুকি। ট্রাফিক পুলিশে গাড়ি আটকাইয়া দুইবারে দেড় হাজার টাকা ঘুষ নিয়া গাড়ি ছাড়ছে। রিকশা ভাড়া না বাড়াইয়া করবাম কী?” পাশে দাঁড়ানো আরেক রিকশা চালক কবির মিয়া বলেন,’ বছরে এককালীন ৩০ হাজার টাকা লাইসেন্সের জন্য আর গাড়ির ভাড়া হিসেবে ডেইলি ৪৫০ ট্যাকা গ্যারেজের মালিকরে দেওন লাগে।সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত গাড়ি চালাইয়া ইনকাম করছি নয়শো ট্যাকা। নিজের চা বিড়ির খরচ হইছে পঞ্চাশ ট্যাকা।জিনিসপত্র এহন যে দাম।পাচ জনের সংসার কী চাইরশো ট্যাকা দিয়া চলে?” ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকায় হাইকোর্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচলে পৌরসভার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়ার পর রাতারাতি তৈরি হওয়া লাইসেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সাম্প্রতিক সময়ে অটোরিকশায় যাত্রী পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, ” পৌরসভা কর্তৃক প্রদানকৃত নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত রিক্সার লাইসেন্স সংখ্যা (ডুপ্লিকেট লাইসেন্স ব্যতীত) তিন হাজার।এই তিন হাজার লাইসেন্সের মালিক সর্বোচ্চ ৫০ জন।প্রকৃত রিক্সার ড্রাইভার এর কোন লাইসেন্স নাই। লাইসেন্সের মালিককে লাইসেন্স ভাড়া বাবদ অগ্রিম বার্ষিক সর্বনিম্ন পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হয়।রিক্সার ব্যাটারি চার্জ এবং মেইনটেন্যান্স ড্রাইভার এর উপর।ফলে রিক্সার ড্রাইভার জিম্মি লাইসেন্সের মালিকের কাছে এবং আমরা জিম্মি রিক্সার ড্রাইভার এর কাছে।এই অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিক্সা অবিলম্বে বন্ধ করে প্যাডেল যুক্ত রিক্সা চালু করলে এবং রিক্সার প্রকৃত মালিককে লাইসেন্স প্রদান করলে সবকিছুর সমাধান সম্ভব। এইজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে জনমত গড়ে তুলতে হবে।”
পৌর এলাকার ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা আসিফ আহমেদ সুমিত বলেন,”কুমারশীল মোড় থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত রিক্সাভাড়া ছিল পনেরো টাকা আর এখন ত্রিশ টাকার কমে কোন রিক্সা এই পথে আসতে চায় না।” পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, “পৌরসভা রিক্সার লাইসেন্স দিয়েছিল শহরে যানজট কমানোর জন্য কিন্তু যানজট তো কমেই নি বরং লাইসেন্স সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে রিকশা ভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এর একটা বিহিত প্রয়োজন।”
পৌর এলাকায় পৌরসভা কর্তৃক নির্ধারিত রিকশা ভাড়ার তালিকা কার্যকর আছে কি-না জানার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আব্দুল কুদ্দুসের মোবাইলে কল দিলে তিনি মিটিং এ ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।
পৌরসভার পক্ষ থেকে রিকশা ভাড়ার তালিকা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেই রিকশা ভাড়া নাগালের মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করেন শহরের সচেতন নাগরিকবৃন্দ।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics