Tepantor

দূর্নীতিতে অপ্রতিরোধ্য ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাব-রেজিস্ট্রার অফিস – পর্ব ১

21 October, 2024 : 5:06 pm

তেপান্তর রিপোর্ট: ‘সাব-রেজিস্ট্রার অফিস ভবনের ইটেও টাকা চায়। ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না। যাঁরা আসেন তাঁরা মানসিকভাবে প্রস্তুতি নিয়েই আসেন, আসতে হয়। এখানে ফেরেশতা আসলেও টাকা দিতে হবে।’ ক্ষোভের সঙ্গে এসব কথা বলছিলেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা রামরাইল এলাকার সাইফুল।

অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ও সেনাবাহিনীসহ যৌথবাহিনীর অভিযান চলাকালেই দুর্নীতির উৎসবে মেতে রয়েছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব রেজিস্ট্রার অফিস। ছাত্র আন্দোলনের সময় কয়েকদিন ঘুষ দূর্নীতি বন্ধ থাকলেও নতুন সরকার গঠন হওয়ার পর অফিসের কর্মকর্তা কর্মচারীরা আগের রূপে ফিরে আসতে খুব বেশি সময় নেইনি।  নতুন সরকার গঠন হয়েছে মাত্র দুই মাসের কিছু বেশি সময়। এরমধ্যেই সরকারি পাবলিক সার্ভেন্ট অফিসগুলো সম্পূর্ণরূপে আগের অবস্থায় ফিরে এসেছে। এতে করে রক্ত দিয়ে ছাত্র-জনতার অর্জিত বিজয় ম্লান হয়ে যাচ্ছে বলে মনে করছেন অনেকে।

গত ১০ অক্টোবর থেকে ২০ অক্টোবর পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, জমির ক্রেতা-বিক্রেতা, দলিল লেখক আর দালালের প্রচণ্ড ভিড় ভেতরে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, দালালেরা নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে সহজেই জমি নিবন্ধনের কাজ করিয়ে দেন। কাগজপত্রে সমস্যা থাকলেও ঠিকমতো যাচাই করা হয় না। আর দালাল ছাড়া গেলে অনেক ভোগান্তি পোহাতে হয়।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিভিন্ন উপজেলার বেশ কিছু সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে খোঁজ নিয়েও একই চিত্র পাওয়া গেছে। অনেক সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের যোগসাজশে জাল দলিল তৈরির চক্রও সক্রিয়।

দেশে ভূমি হস্তান্তর দলিল নিবন্ধন হচ্ছে ১৯০৮ সালের রেজিস্ট্রেশন আইনে। এ আইন অনুযায়ী ভূমি নিবন্ধনের দায়িত্ব সাব-রেজিস্ট্রারের। সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়-গুলো দেখভাল করে আইন মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা নিবন্ধন অধিদপ্তর।

ঘুষ আদায়ের অলিখিত নিয়ম:
জেলার অধিকাংশ সাব-রেজিস্ট্রার কার্যালয়ে ঘুষ আদায়ের নিজস্ব কিছু নিয়ম বানানো হয়েছে। যেমন, ভূমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে সরকারি ফি’র বাইরেও জমির মূল্যের দশমিক ৫ শতাংশ অর্থ দিতে হবে সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য। অর্থাৎ জমির মূল্য ১ কোটি টাকা হলে ৫০ হাজার টাকা সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য আলাদা দিতে হবে। দলিল লেখকদের কাছ থেকে ওই টাকা আদায়ের জন্য কিছু লোক নির্ধারিত করে দেয় সাব-রেজিস্ট্রার বা তাদের সিস্টেম।

ঘুষের বিনিময়ে রাজস্ব ফাঁকি :
ব্রাহ্মণবাড়িয়া সাব-রেজিস্টার অফিসে জমি নিবন্ধনের ক্ষেত্রে ঘুষ আদায়ের পাশাপাশি রাজস্ব ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ আছে। জমির শ্রেণি পরিবর্তন করে এবং বাজারমূল্য কম দেখিয়ে দলিল নিবন্ধন করে সরকারকে রাজস্ব বঞ্চিত করার অভিযোগ আছে সাব-রেজিস্ট্রারের বিরুদ্ধে। জমির প্রকৃত দামের চেয়ে কম দাম দেখিয়ে নিবন্ধন করায় নিবন্ধন ফি কম দিতে হয়। এ ক্ষেত্রে সরকার যথাযথ রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয়।
নিবন্ধন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, প্রতিবছর গড়ে ৩৫ লাখের বেশি দলিল নিবন্ধন হয়। এতে রাজস্ব আয় হয় বছরে ১০ হাজার কোটি টাকার বেশি।

ঘুষের টাকা ভাগাভাগি:
দলিল নিবন্ধনে ঘুষ বাবদ আদায় করা অর্থ ভাগ করে নেন সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী, দলিল লেখক ও সংশ্লিষ্ট দালালেরা।
অভিযোগ আছে, সদর সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে দলিল লেখকেরাই দলিল করার সময় অফিস খরচের অজুহাতে বাড়তি টাকা নেন। জানা যায়, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নিয়ন্ত্রণ এক অফিস সহকারীর হাতে। ঘুষের ২০ শতাংশই নেন তিনি। ৫০ শতাংশ দেন সাব-রেজিস্ট্রারকে, বাকি ৩০ শতাংশ ভাগাভাগি হয় অন্যদের মধ্যে।

দলিল লেখকদের বিরুদ্ধে বিস্তর অভিযোগ:
জমির দলিল নিবন্ধনের ক্ষেত্রে দলিল লেখকদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের ৫০১টি সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে প্রায় ৯৮ হাজার নিবন্ধিত দলিল লেখক আছেন। তাঁরা জমির ক্রেতা-বিক্রেতার চাহিদা অনুসারে দলিল লেখেন। এর জন্য নির্ধারিত হারে পারিশ্রমিক নেওয়ার কথা। ১৯৯৪ সালে আইন মন্ত্রণালয় থেকে দলিল লেখকদের পারিশ্রমিকের হার নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। কিন্তু দলিল লেখকেরা সে নির্দেশনা উপেক্ষা করে সেবাগ্রহীতাদের থেকে ইচ্ছেমতো টাকা নেন। না দিলে নানাভাবে হয়রানি করেন। অনেক সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের নিয়ন্ত্রকও দলিল লেখকেরাই। অনেক সময় সাব-রেজিস্ট্রার অফিসের এজলাসে সাব-রেজিস্ট্রারের পাশে দাঁড়িয়ে নিবন্ধন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করেন দলিল লেখক সমিতির নেতারা। জমির শ্রেণিসহ কাগজে গরমিল থাকলেও ঘুষের বিনিময়ে দ্রুত রেজিস্ট্রির ব্যবস্থা করেন তাঁরা। একাধিক দলিল লেখক নাম প্রকাশ না করা শর্তে বলেন, প্রতিটি সাব-কবলা দলিল রেজিস্ট্রি করতে প্রথমে সাব-রেজিস্ট্রারের জন্য ২ হাজার টাকা, একটি রাজনৈতিক দলের দলিল লেখকদের সমিতির নামে ১ হাজার ৫০০ টাকা দিতে হয়। প্রতি হেবা দলিলে সরকারি চার্জ ১ হাজার ৫০০ টাকা হলেও নেওয়া হয় ৭-৮ হাজার টাকা।

শুধু তাই নয়, দলিল লেখক সমিতির বিরুদ্ধে দলিলপ্রতি লাখে ১ হাজার টাকা চাঁদা নেওয়ার অভিযোগও আছে। সমিতির নেতারা এই টাকা আদায় করেন। অভিযোগ রয়েছে, সাব-রেজিস্ট্রার অফিসে নির্ধারিত অর্থের চেয়ে দ্বিগুণ টাকা দিতে হয় দলিল লেখকদের। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সাব-রেজিস্ট্রার বলেন, ‘দলিল লেখকের পারিশ্রমিকের বিষয়ে সরকারের নির্দেশনা অনেক আগের, সেটা আপডেট না করায় তাঁরা ইচ্ছেমতো টাকা নেন।’

এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে গত ২০ ও ২১ অক্টোবর দুদিন যাবৎ ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর সাব রেজিস্ট্রার, এছাড়াও দলিল লেখক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমানকে একাধিকবার মোবাইল ফোন কল করেও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

চলবে….

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array