Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে রিক্সা ভাড়ায় সন্ত্রাসী স্টাইল

17 February, 2025 : 3:28 pm

ছবি: সংগ্রহীত

সীমান্ত খোকন: ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে রিক্সাওয়ালারা যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছে, আর যাত্রীরা এর প্রতিবাদ করলে রিক্সাওয়ালারা যাত্রীদেরকে বিভিন্ন ভাবে হেনস্তা করছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। অনেক যাত্রীদের ভাষায়, রিক্সাওয়ালারা অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের জন্য যাত্রীদের সাথে সন্ত্রাসবাদ চালিয়ে যাচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে। এবং এসব রিক্সাওয়ালাদের বেশিরভাগ বাইরের জেলা থেকে আসা, যারা কিছু টাকা বেশি আদায় করার জন্য যাত্রীদের সাথে অশোভন আচরণ করে ও বিভিন্ন ভাবে হুমকি-ধামকি দিয়ে থাকে। প্রায় সময় শহরের বিভিন্ন স্থানে যাত্রী ও রিক্সাওয়ালাদের মধ্যে মারামারির ঘটনা ঘটতে দেখা যায়। একারনে সম্মানের ভয়ে যাত্রীরা তখন বেশি ভাড়া দিতে বাধ্য হয়। গত দেড় বছরের ব্যবধানে শহরে রিক্সা ভাড়া বেড়েছে ৩ গুন। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে মধ্যবিত্তরা।

তবে বেশিরভাগ রিক্সাওয়ালা বলছেন, রিক্সার লাইসেন্স ভাড়া, মালিকের কাছ থেকে রিক্সা ভাড়া করা ও ট্র্যাফিক পুলিশের ঘুষ, এই তিন জায়গায় টাকা দেওয়ার কারণে বাধ্য হয়ে ভাড়া বেশি নিতে হয় যাত্রীদের কাছ থেকে।

একজন ভুক্তভোগী মেড্ডা এলাকার বাসিন্দা আরিফ বলেন, রিক্সাওয়ালাদেকে অতিরিক্ত ভাড়া না দিলে তারা যাত্রীদের সাথে খারাপ আচরণ করে। আমার সাথে একবার অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার পর আমি তাকে প্রশ্ন করি ওই জায়গার ভাড়া জানে কিনা, তখন রিক্সাওয়ালা বলে তার জানার দরকার নেই। এটা ছাড়াও তারা বিভিন্ন সময় নানা রকম খারাপ আচরণ ও হুমকি ধামকি দেয় যার ফলে কয়েকবার রিক্সাওয়ার সাথে আমার হাতাহাতি হয়েছে। কিন্তু এভাবে আর কত দিন?
আরিফ বলেন, খারাপ আচরণ করে ইজ্জতের ভয় দেখিয়ে যারা অতিরিক্ত ভাড়া নেয় তাদের বেশির ভাগ রিক্সাওয়ালা ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বাইরের। এজন্য তাদের নিজেদের কোন ইজ্জতের ভয় নেই ও অন্যদেরও ইজ্জত দেয় না। তারা নিজেরা চর-থাপ্পর খেয়েও যদি ১০/২০/৩০টাকা বেশি আদায় করতে পারে এটাই তাদের লাভ। কারণ এই শহরে তাদের পরিচিত কেউ নেই তাই ইজ্জতের ভয়ও নেই, বলেন আরিফ।

শুধু রিক্সা ভাড়া নয়, শহরে অতিরিক্ত রিক্সা ও অটোরিক্সা কারণে যানজট তৈরি হয়, যা সমাধানে পৌরসভা কর্তৃক রিক্সা ও অটোরিক্সার লাইসেন্স সিস্টেম চালু করে। কিন্তু দুর্নীতি ও অনিয়মের কারণে সেই লাইসেন্স সিস্টেম কোন কাজে আসেনি। বরং এক শ্রেণীর অসাধু লোক সেই লাইসেন্স নিয়ে তারা লাইসেন্স ভাড়া দেয় রিক্সাওয়ালাদের কাছে। এবং এই লাইসেন্স সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে গত মাস দেড়েক আগে ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রেসক্লাবের সামনে সাধারণ রিক্সাওয়ালারা সমাবেশ করেছিলো। যদিও তার কোনো ফল পাওয়া যায়নি।
আবার এক শ্রেণীর মানুষ আছে যারা কোন কিছু চিন্তা না করে রিক্সা কিনে শহরে চালানো শুরু করে। কারণ দেড় লক্ষ টাকার রিক্সা কিনে তা দিয়ে মাসিক ইনকাম হচ্ছে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা। এভাবেও প্রতিদিন রিক্সার সংখ্যা বাড়ছে বলে জানা গেছে। এদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ না থাকায় হরহামেশাই ঘটছে দুর্ঘটনা।

বর্তমানে রিকশা ভাড়া অতিরিক্ত বৃদ্ধিতে সাধারণ যাত্রীদের মনে তীব্র ক্ষোভ দেখা দিয়েছে। দ্রব্যমূল্যের ক্রমাগত বৃদ্ধিতে এমনিতেই মধ্যবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্ত শ্রেণির নাভিশ্বাস চরমে। এরমধ্যে আবার রিকশা ভাড়ার এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি মেনে নিতে পারছে না শহরের সাধারণ মানুষ। বিশেষ করে স্বল্প দূরত্বের যাত্রীরা পড়েছেন বিপাকে। যদিও শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানসমূহে পৌরসভার পক্ষ থেকে পুরো শহরের রিকশা ভাড়া নির্ধারণ করে সাইনবোর্ড লাগানো হয়েছে। তবে পৌর কর্তৃপক্ষ ঐ সাইনবোর্ড টানিয়েই দায় সেরেছিল। আর এখন সরকার পতনের পর এসব বিষয় নিয়ন্ত্রণে কারও কোন দায়িত্বশীলতা দেখা যাচ্ছেনা।

পৌরসভার তালিকানুযায়ী রিক্সা চালকেরা যাত্রীদের কাছ থেকে ভাড়া নিচ্ছে কি-না,এ ব্যাপারে নেই কোন তদারকি। তালিকা অনুযায়ী বিরাসার বাসস্ট্যান্ড থেকে আনন্দবাজার পর্যন্ত রিকশা ভাড়া হওয়ার কথা ৩৫ টাকা, কিন্তু রিকশা চালকরা সেই ভারা সর্বম্নি ৬০ টাকার নিচে যেতে চান না। তালিকায় ট্যাংকেরপাড় মোড় থেকে সদর হাসপাতাল পর্যন্ত রিকশা ভাড়া হওয়ার কথা ১০ টাকা কিন্তু রিকশা চালকদের দাবি ২০ টাকার নিচে শহরে কোন রিকশাভাড়া নেই অর্থাৎ রিক্সায় চড়লেই ২০টাকা ভাড়া।
টেংকেরপাড় গেটের সামনে কথা হয় রিকশাচালক বাচ্চু মিয়ার সাথে। পৌরসভার ভাড়ার তালিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন ,” পৌরসভার কারণেই তো ভাড়া বেশি নেওন লাগে। পৌরসভা লাইসেন্স যহন ছাড়ে তখন এক হাজার ট্যাহার লাইসেন্স পাইতে গেলে খরচ হয় দশ থেকে পনেরো হাজার ট্যাহা। যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া বাড়াইয়া না নিলে অতলা ট্যাহা জমামু কেমনে? ” শহরের কাউতলী মোড়ের রিকশা চালক নয়ন মিয়া এই প্রতিবেদককে বলেন ,” দশ হাজার টাকা লইয়্যা দুই মাস ঘুইরা লাইসেন্স না পাইয়া অহন আরেকজনের লাইসেন্স ডেইলি ২০০ টাকা রোজে ভাড়া লইছি। পৌরসভার তালিকা মানা কেমনে সম্ভব!” শহরের মেড্ডা বাসস্ট্যান্ডে কথা হয় ফুলবাড়িয়ার ভাড়াটিয়া রিকশা চালক মিলন মিয়ার সঙ্গে। তিনি বলেন,” আমার বাড়ি মমিসিং। আমি ভাদাইম্মা ব্যাডারেতো পৌরসভা লাইসেন্স দিতো না। লাইসেন্স ছাড়াই মাঝেমধ্যে শহরে রিকশা লইয়্যা ঢুকি। ট্র্যাফিক পুলিশে গাড়ি আটকাইয়া দুইবারে দেড় হাজার টাকা ঘুষ নিয়া গাড়ি ছাড়ছে। রিকশা ভাড়া না বাড়াইয়া করবাম কী?” পাশে দাঁড়ানো আরেক রিকশা চালক কবির মিয়া বলেন,’ বছরে এককালীন ৩০ হাজার টাকা লাইসেন্সের জন্য আর গাড়ির ভাড়া হিসেবে ডেইলি ৪৫০ ট্যাকা গ্যারেজের মালিকরে দেওন লাগে। সকাল আটটা থেকে সন্ধ্যা সাতটা পর্যন্ত গাড়ি চালাইয়া ইনকাম করছি নয়শো ট্যাকা। নিজের চা বিড়ির খরচ হইছে পঞ্চাশ ট্যাকা। জিনিসপত্র এহন যে দাম। পাঁচ জনের সংসার কী চাইরশো ট্যাকা দিয়া চলে?”

ছবি: সংগ্রহীত

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌর এলাকায় হাইকোর্ট কর্তৃক নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত রিকশা চলাচলে পৌরসভার পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক অনুমতি দেয়ার পর রাতারাতি তৈরি হওয়া লাইসেন্স সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে প্রথম থেকেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সোচ্চার ছিলেন জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক প্রচার সম্পাদক সৈয়দ নজরুল ইসলাম। সাম্প্রতিক সময়ে অটোরিকশায় যাত্রী পরিবহন ভাড়া বৃদ্ধিতে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, ” পৌরসভা কর্তৃক প্রদানকৃত নিষিদ্ধ ব্যাটারি চালিত রিক্সার লাইসেন্স সংখ্যা (ডুপ্লিকেট লাইসেন্স ব্যতীত) তিন হাজার। এই তিন হাজার লাইসেন্সের মালিক সর্বোচ্চ ৫০ জন। প্রকৃত রিক্সার ড্রাইভার এর কোন লাইসেন্স নাই। লাইসেন্সের মালিককে লাইসেন্স ভাড়া বাবদ অগ্রিম বার্ষিক সর্বনিম্ন পঞ্চাশ হাজার টাকা দিতে হয়।রিক্সার ব্যাটারি চার্জ এবং মেইনটেন্যান্স ড্রাইভার এর উপর।ফলে রিক্সার ড্রাইভার জিম্মি লাইসেন্সের মালিকের কাছে এবং আমরা জিম্মি রিক্সার ড্রাইভার এর কাছে।এই অবৈধ ব্যাটারি চালিত রিক্সা অবিলম্বে বন্ধ করে প্যাডেল যুক্ত রিক্সা চালু করলে এবং রিক্সার প্রকৃত মালিককে লাইসেন্স প্রদান করলে সবকিছুর সমাধান সম্ভব। এইজন্য ঐক্যবদ্ধভাবে জনমত গড়ে তুলতে হবে।”

পৌর এলাকার ফুলবাড়িয়ার বাসিন্দা আসিফ আহমেদ সুমিত বলেন,”কুমারশীল মোড় থেকে ফুলবাড়িয়া পর্যন্ত রিক্সাভাড়া ছিল পনেরো টাকা আর এখন ত্রিশ টাকার কমে কোন রিক্সা এই পথে আসতে চায় না।” পাইকপাড়া এলাকার বাসিন্দা আব্দুল কাদির বলেন, “পৌরসভা রিক্সার লাইসেন্স দিয়েছিল শহরে যানজট কমানোর জন্য কিন্তু যানজট তো কমেই নি বরং লাইসেন্স সিন্ডিকেটের কবলে পড়ে রিকশা ভাড়া লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। এর একটা বিহিত প্রয়োজন।”

পৌরসভার পক্ষ থেকে রিকশা ভাড়ার তালিকা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করলেই রিকশা ভাড়া নাগালের মধ্যে চলে আসবে বলে মনে করেন শহরের সচেতন নাগরিকবৃন্দ।

 

কেএআই/এসকে/তেপান্তর

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array