এসব সমস্যা নিয়ে কয়দিন পরপর পত্র পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশ হলেও কর্তৃপক্ষের টনক নড়েনা। খালটির নব্যতা সঙ্কটসহ বিভিন্ন সমস্যা সমাধানের জন্য বড় বড় বাজেটের টাকা আসলেও স্থায়ী সমাধান না করে নামমাত্র কাজ করেন খালটির দায়িত্বে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলো। এছাড়া খালের উভয় পাশের ব্যক্তি মালিকগণ প্রায় জায়গাতে ভরাট করে অবৈধ বাড়ীঘর, স্থাপনাসহ দোকানপাট দিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
গত কয়েক বছর আগে বিশ্বব্যাংক থেকে কয়েক কোটি টাকার বাজেট আসলেও খালটির উন্নয়নে তেমন কোন কাজ করা হয়নি। বরং সৌন্দয্যবর্ধনের নামে অপরিকল্পিতভাবে কিছু কাজে খালটির আরো ক্ষতি করা হয়েছে বলে অভিযোগ অনেকের।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের দেয়া তথ্যমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার বড় গোকর্ণ মৌজা, পৈরতলা মৌজা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর এই তিন মৌজায় খালটির দৈঘ্য প্রায় ৩ কিলোমিটার। টান বাজার তিতাস নদীর পশ্চিম পাড় থেকে একেবারে গোকর্ণ নদীর ঘাট পর্যন্ত সংযুক্ত এই খালটির গভীরতা ছিল ২০ ফুট। কিন্তু সেটি কমে গিয়ে বর্তমানে আছে মাত্র ৬/৭ ফুট।
এছাড়া শহরের বাসিন্দাদের ময়লা আবর্জনায় ভরে গিয়ে খালটির নাব্যতা সঙ্কট এখন তীব্র আকার ধারণ করেছে। এদিকে খালটির দু’পাশে সৌন্দয্যবর্ধন করতে গিয়ে উপরিভাগে প্রশস্ত থাকলেও নিচের অংশে সংকোচিত করে ফেলা হয়েছে। ফলে খালটির নব্যতা ফেরাতে খনন করা যাচ্ছেনা। খনন করলেই খালের দু’পাশে থাকা সিসি ব্লকগুলো ভেঙ্গে পড়বে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা পরিষদের সহযোগী সার্ভেয়ার মো: রজব আলীর দেয়া তথ্যমতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার পৈরতলা মৌজার ৩১৭ দাগের বি,এস (খাল) পৈরতলা ব্রীজের পশ্চিম পার্শ্বের এবং খাল সংলগ্ন দক্ষিন পার্শ্বের বেশ কিছু জায়গা বেদখল হয়ে আছে।
দখলকৃত ব্যক্তিরা হলেন, মোছা: শাহারা খাতুন, তাজু মিয়া, মোছা: রোমানা বেগম, আ: জলিল, মো: জাহের মিয়া, সংকর মিস্ত্রিী, ধন মিস্ত্রী, সন্তোষ বণিক, মো: বাচ্চু মিয়া।
মোছা: শাহারা খাতুন মৃত আবু তাহেরের স্ত্রী, তার দখলে রয়েছে ৩৩০ বর্গফুট, তাজু মিয়া মো: জমু মিয়ার ছেলে, তার দখলে রয়েছে ৪০০ বর্গফুট, মোছা: রোমানা বেগম সাফাউদ্দিনের স্ত্রী, তার দখলে রয়েছে ৫২৫ বর্গফুট, আ: জলিল মৃত শফর আলীর ছেলে, তার দখলে রয়েছে ১৪৪ বর্গফুট, মো: জাহের মিয়া মৃত মহব্বত আলীর
ছেলে, তার দখলে রয়েছে ১৫৪ বর্গফুট, সংকর মিস্ত্রি মৃত ললিত মিস্ত্রির ছেলে, তার দখলে রয়েছে ৮৪০ বর্গফুট, ধন মিস্ত্রী মৃত ললিত মিস্ত্রির ছেলে, তার দখলে রয়েছে ৫৮৮ বর্গফুট, সন্তোষ বণিক প্রতিত বণিকের ছেলে, তার দখলে
রয়েছে ২৮০ বর্গফুট, এবং মো: বাচ্চু মিয়া সাদেক মিয়ার ছেলে, তার দখলে রয়েছে ৩১০ বর্গফুট জায়গা। তারা সবাই দক্ষিণ পৈরতলা গ্রামের বাসিন্দা।
জেলা পরিষদ সূত্রে আরো জানা যায়, সম্প্রতি এ বছর টাউন খালটি পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা করার জন্য জেলা পরিষদ থেকে ১০ লাখ টাকা বাজেট হয়েছিল। তিতাস নদী সংলগ্ন টান বাজার থেকে শহরের কাজীপাড়া পর্যন্ত শুধু নামমাত্র কচুরিপানা পরিষ্কার করেই এই বাজের টাকা খরচ হয়েছে বলে সূত্র জানায়। আর কাজীপাড়া থেকে ছয়বাড়িয়া হয়ে আমিনপুর গোকর্ণঘাট নদী পর্যন্ত বাকি অংশটুকু আগের অবস্থায় পড়ে আছে।
জানা যায়, ২০০৯ সালে হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) পৌরসভার মেয়র থাকাকালীন সময়ে সৌন্দয্যবর্ধনের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ে বিউটিফিকেশন (স্টিপ-২) নামক একটি প্রকল্প হাতে নেয়। তৎকালীন সময়ে পৌরবাসীর সাথে কোনরকম পরামর্শ ছাড়াই মনগড়াভাবে এই প্রকল্পের কাজ হাতে নেওয়ায় ২০০৯ সালের ১৮ মে জেলা ও পৌর নাগরিক কমিটির নেতৃবৃন্দ এক প্রতিবাদ সমাবেশ করেন। ম,ফ কাইয়ুম খান খুকুর সঞ্চালনায় ও জেলা নাগরিক কমিটির সভাপতি প্রবীণ রাজনীতিবিদ আলহাজ্ব এডভোকেট আব্দুস সামাদের সভাপতিত্বে উক্ত প্রতিবাদ সভায় ওই কমিটির নেতৃবৃন্দগণ গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন এবং এ ব্যপারে পৌর কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষনও করেন তারা।
পরে অবশ্য পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) বিদেশ থেকে ফিরে এসে ২০০৯ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর এক সংবাদ সম্মেলনে টাউন খালের সোন্দয্যবর্ধনের জন্য বিউটিফিকেশন (স্টিপ-২) প্রকল্পের বর্ণনা দেন পৌরবাসীর নিকট।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) বক্তব্য দিতে রাজি হয়নি। ভাইয়ের অসুস্থতা ও বিভিন্ন সমস্যাজনিত কারণ দেখিয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে তৎকালীন সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের জেলা কমিটির সভাপতি ও বর্তমান জেলা বিএনপির নেতা আতিকুর রহমান ভূঁইয়া জানান, তৎকালীন সময়ে হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) মেয়র থাকা অবস্থায় টাউন খালের সৌন্দর্যবর্ধণের জন্য পৌরসভা থেকে যে প্ল্যানটি পাশ করা হয়েছিল তা সঠিক ছিলোনা। ওই প্ল্যান অনুযায়ী কাজ করলে এই খালটি একটা সময় নালায় পরিণত হবে ভেবে আমরা এর প্রতিবাদ করেছিলাম। পূর্বে যা ভেবেছিলাম আজ তাই হয়েছে।
কাজীপাড়া ফাইভ স্টার ক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হাজী কামাল উদ্দিন জানান, তৎকালীন সময়ে কাজীপাড়াস্থ ফাইভ স্টার ক্লাবের আমন্ত্রণে কেন্দ্রীয় পরিবেশ আন্দোলন (পবা’র) সভাপতি আবু নাছের খাঁন ব্রাহ্মণবাড়িয়া এসেছিলেন। পরে টাউন খাল সম্পর্কে বিভিন্ন বিষয়ে তৎকালীন পৌর মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি’র সাথে কথা বলেন। তখন তিনি (তৎকালীন মেয়র) সভাপতিকে আশ্বস্ত করেছিলেন যে তিতাস নদীর সাথে লেয়ার ঠিক রেখে খালটির কাজ করা হবে, মূল তিতাসের টান বাজার নামক স্থান থেকে পৈরতলা ব্রীজ পর্যন্ত পথচারীদের পায়ে হাঁটার পথ রাখা হবে এবং সেইসাথে উপরিভাগ ও নিচের অংশ ঠিক রেখে খালটির সৌন্দর্য্যবর্ধণ করা হবে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি বরং সব প্ল্যান ভেস্তে দিয়ে মনগড়াভাবে কাজ করে খালটিকে ধ্বংস করে দিয়েছে।
তিনি আরো বলেন, হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি’র) মেয়াদে টান বাজার থেকে শহরের ফকিরাপুল ব্রিজ পযর্ন্ত টাউন খালের কাজ সমাপ্ত করেছেন। নতুন মেয়াদে হেলাল উদ্দিন মেয়র নির্বাচিত হওয়ার পর শহরের ফকিরাপুল ব্রিজ থেকে র্গোকণঘাট পযর্ন্ত অসমাপ্ত বাকি কাজটুকু তিনি করেছেন। তিনিও তার দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করেননি। ফলে খালটির উন্নয়ন এখানেই থমকে গেছে।
বার্ডেম এফিলিয়েটেড ব্রাহ্মণবাড়িয়া ডায়াবেটিক হাসপাতালের উদ্যোক্তা ও প্রতিষ্ঠাতা এম উমর ফারুক এর মতে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরকে যদি হৃৎপিণ্ড মনে করেন তাহলে তার ডান অলিন্দ এন্ডার্সন খাল তথা কুরুলিয়া খাল আর বাম অলিন্দ হল শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত টাউন খাল। একটা অলিন্দ বন্ধ হয়ে হয়ে গেলে যেমন মানুষ বাঁচেনা তেমনি শহরের টাউন খালটি ভরাট হয়ে গেলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরটি পরিত্যক্ত হয়ে যাবে। কারণ উজান থেকে নেমে আসা পানি নিষ্কাশনের একমাত্র পথ এই টাউন খাল যা আমাদের বন্যার ভয়াবহতা থেকে রক্ষা করে।
এবিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক আলহাজ্ব শাহ আলম জানান, ২০০৯ সালে যখন তৎকালীন পৌরসভার মেয়র হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) খালটি সংস্কারের জন্য কাজ করেছিলেন তখন সেই কাজে ত্রুটি দেখা গেলে আমরা তাতে বাঁধা দেই। কিন্তু পৌরসভা তা অগ্রাহ্য করেই তাদের কাজ চালিয়ে যায়। খালটির উপরের ভাগ প্রশস্ত থাকলেও খালের দুই পাড়ে সিসি ব্লকের মাধ্যমে নিচের অংশ সংকোচিত করে ফেলা হয়েছে। খালের নিচের অংশ ছোট হয়ে যাওয়ায় খালটিকে এক প্রকার মেরে ফেলা হয়েছে।
এ বিষয়ে পৌর মেয়র মিসেস নায়ার কবির জানান, শহরের টাউন খালটি মূলত এটা জেলা পরিষদের খাল। এই খালে সবসময়ই ময়লার স্তুপ পড়ে থাকে। গত বছর আমরা পৌরসভা থেকে এ খালটিকে পরিষ্কার করেছি। এ বছর জেলা পরিষদ আবার পরিষ্কার করেছে। আসলে আশেপাশের লোকজন ময়লা ফেলে খালটিকে নষ্ট করে দিচ্ছে। আমরা তাদেরকে বারবার নিষেধ করলেও তারা শুনেননা। প্রয়োজনে এই খালটিকে আবারও পরিষ্কার করার জন্য আমরা জেলা পরিষদকে চিঠি দিবো।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আলহাজ্ব মো: শফিকুল আলম এমএসসি প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে বিভিন্ন অজুহাত দেখিয়ে ঘুরানোর পরও কোন বক্তব্য দেননি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার সাবেক মেয়র ও বর্তমান ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক আল মামুন সরকার খালটির সম্পর্কে বিস্তারিত বর্ননা দিতে গিয়ে বলেন, প্রায় আড়াই লক্ষাধিক মানুষের বসবাস এই শহরে। গোটা শহরের পানি নিষ্কাশনের জন্য এই খালটিই একমাত্র প্রধান খাল যা ‘শহর খাল বা টাউন খাল’ হিসেবে পরিচিত। ১৯৯৮ সালে আমি যখন পৌরসভার মেয়র ছিলাম তখন শহরবাসীর দুর্ভোগের কথা চিন্তা করে পানি নিষ্কাশনের জন্য প্রথম আমি একটা প্রকল্প হাতে নিই। আমার মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় পরবর্তীতে সেটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। আমার পরে হাফিজুর রহমান মোল্লা (কচি) যখন মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হয়ে আসলেন তার সময়ে এই খালটি শহর সৌন্দর্যবর্ধনের জন্য প্রায় ৭ কোটি টাকা ব্যয়ের একটি প্রকল্প আসে। সৌন্দর্যবর্ধনের নামে ওই প্রকল্পের মাধ্যমে তিনি উপরের অংশ থেকে নিচের অংশ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে এই খালটিকে সংকোচিত করে ফেলেছেন।
তিনি বলেন, এই খালটিকে দ্রুত খনন ও সংস্কার করার জন্য ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাংসদ র.আ.ম উবায়দুল মোক্তাদির চৌধুরী জেলা পরিষদকে চাপসৃষ্টি করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অনেক চাপ সৃষ্টির পর প্রায় এক বছর পরে শুধুমাত্র খালের উপরের কচুরিপানা পরিষ্কারের জন্য ১০ লক্ষ টাকার একটি প্রজেক্ট বরাদ্দ করেন। কিন্তু এই খালটি যে গত ২০ বছরে ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে তার জন্য আজ পর্যন্ত জেলা পরিষদ থেকে কোন কাজ করা হয়নি।
জেলা পরিষদের বর্তমান চেয়ারম্যানকে অথর্ব চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের মানুষ বারবার তাকে অনুরোধ করে এমনকি চাপসৃষ্টি করার পরও শহরের এই গুরুত্বপূর্ণ খালটিকে আমরা খনন করাতে পারিনি। অথচ জেলা পরিষদ থেকে বিভিন্ন প্রকল্পের নামে বরাদ্দের কোটি কোটি টাকা তিনি পকেটস্থ করে লোপাট করছেন। আগে কখনোই এই শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হতোনা আর এখন সামান্য বৃষ্টিতেই জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এজন্য তিনি জেলা পরিষদকেই দায়ী করেছেন। এই খালের নামে জেলা পরিষদ থেকে কোটি কোটি টাকা খরচ করে তারা যে কাজটি করছেননা এজন্য সরকারের কাছে তাদেরকে কৈফিয়ত তলব করা হোক। পাশাপাশি ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাসীর স্বার্থে এবং এই খালটিকে বাঁচাতে জেলা পরিষদকে বাদ দিয়ে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় থেকে একটি প্রকল্প টিম গঠন করে গুরুত্বপূর্ণ এই খালটির খনন কাজ সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্টদের অনুরোধ জানান তিনি।