Tepantor

জামিন পেয়েও রেহাই নেই, মুক্তির আগে ‘ঘুষ’! ব্রাহ্মণবাড়িয়া কারাগারের অনিয়মের খতিয়ান-পর্ব ২

19 August, 2026 : 5:49 pm
ভর্তি ও মুক্তি শাখায় দায়িত্বরত করারক্ষি হাবিবুর রহমান।

সীমান্ত খোকন:

কারাগারে বন্দিত্বের মেয়াদ শেষ কিংবা আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর একজন বন্দির স্বাভাবিক প্রত্যাশা—সব আনুষ্ঠানিকতা শেষে তিনি মুক্ত হয়ে পরিবারের কাছে ফিরবেন। কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার নিয়ে চলমান অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এর বিপরীত এক গুরুতর অভিযোগ। কারাগার থেকে মুক্তি পেতেও গুনতে হয় টাকা। আর সেই টাকার পরিমাণ নির্ধারিত নয়—ব্যক্তিভেদে ৮০০ টাকা থেকে শুরু করে ১৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অভিযোগ রয়েছে, কারাগারের ভর্তি ও মুক্তি শাখায় দায়িত্ব পালনকারী কারারক্ষী হাবিবুর রহমানের মাধ্যমে এসব টাকা আদায় করা হয়। টাকা না দিলে নানা ধরনের ভয়ভীতি দেখানো, ‘শোন অ্যারেস্ট’ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি করা কিংবা মুক্তি প্রক্রিয়ায় জটিলতা তৈরির কথা বলা হয় বলেও অনুসন্ধানে অভিযোগ পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো—আদালতের আদেশে জামিন কিংবা মুক্তির সুযোগ পাওয়ার পরও যদি কোনো বন্দিকে কারাগারের ভেতরে অতিরিক্ত অর্থ দেওয়ার চাপের মুখে পড়তে হয়, তাহলে সেটি শুধু একজন ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতির বিষয় নয়; এটি কারাগারের প্রশাসনিক ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৩০ জুন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার থেকে মুক্তি পান সদর উপজেলার বিরামপুর গ্রামের শামীম নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগ রয়েছে, মুক্তির সময় তাকে বিভিন্নভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে ৩ হাজার টাকা আদায় করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, কারাগারের বাইরে থেকে বিকাশের মাধ্যমে হাবিবুর রহমানের নিজস্ব মোবাইল নম্বরে ওই টাকা গ্রহণ করা হয়।

একই গ্রামের সাচ্চু নামে আরেক ব্যক্তি গত ২ জুলাই কারাগার থেকে মুক্তি পান। তার কাছ থেকে তিন দফায় মোট ১৯ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। মুক্তির সময় এত বিপুল পরিমাণ অর্থ কেন এবং কীসের বিনিময়ে নেওয়া হয়েছিল—এ প্রশ্নেরও সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিরামপুর গ্রামেরই এমরান নামে আরেক ব্যক্তি গত ৪ মে আদালত থেকে জামিন পাওয়ার পর কারাগার থেকে মুক্তি পান। অভিযোগ রয়েছে, তার কাছ থেকেও ৭ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে।

সদর উপজেলার মজলিশপুর গ্রামের বাসিন্দা এবং মজলিশপুর ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মনির গত ২ জুলাই জামিনে মুক্তি পান। অনুসন্ধানে তার কাছ থেকেও ৭ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

অন্যদিকে বিজয়নগরের পান্না নামে এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৮০০ টাকা নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
শুধু এসব ব্যক্তিই নন, নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক আরও কয়েকজন বন্দি ও তাদের স্বজনের কাছ থেকেও কারাগার থেকে মুক্তির সময় বিভিন্ন অঙ্কের টাকা নেওয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে নিরাপত্তা ও হয়রানির আশঙ্কায় তারা প্রকাশ্যে বক্তব্য দিতে রাজি নন বলে জানা গেছে।

অনুসন্ধানে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্যে সবচেয়ে বেশি যে বিষয়টি উঠে এসেছে তা হলো—টাকা আদায়ের ক্ষেত্রে সরাসরি কোনো সরকারি ফি বা নির্ধারিত খরচের কথা বলা হয় না। বরং বিভিন্ন ধরনের ভয়ভীতি ও অনিশ্চয়তা তৈরি করে টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ।

আরও পড়ুন: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগারের অন্দরমহল: দুর্নীতি, নির্যাতন ও অনিয়মের অভিযোগে যা মিলল-পর্ব ১

কোনো বন্দিকে আবার গ্রেপ্তার বা ‘শোন অ্যারেস্ট’ করা হতে পারে, মুক্তির পর কোনো মামলায় জটিলতা তৈরি হতে পারে কিংবা কাগজপত্রের কারণে মুক্তি আটকে যেতে পারে—এ ধরনের আশঙ্কা দেখিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
কারাগারে থাকা একজন বন্দি স্বাভাবিকভাবেই বাইরের মানুষের তুলনায় অনেক বেশি অসহায় অবস্থায় থাকেন। তার পক্ষে আইনগত প্রক্রিয়া, আদালতের আদেশ কিংবা কারাগারের প্রশাসনিক নিয়মকানুন সম্পর্কে তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া কঠিন। ফলে ভয় দেখানো হলে অনেক বন্দি বা তাদের পরিবার পরিস্থিতির চাপে টাকা দিতে বাধ্য হতে পারেন এমন অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।

এই ব্যপারে কারাগারের ভর্তি ও মুক্তি শাখার দায়িত্বরত কারারক্ষী হাবিবুর রহমানের বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি টাকা নেওয়ার বিষয়টি সরাসরি অস্বীকার করতে পারেন নি।

তবে একাধিক সূত্র জানিয়েছে, জেল সুপার মজিবুর রহমানের নির্দেশেই এই টাকা আদায় করা হয়। তিনি মুখে সততার বুলি আওড়ালেও তলে তলে তিনি একজন দূর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তা।
এই সিরিজ প্রতিবেদনের প্রথমেই কারাগারের নানা অনিয়ম ও দূর্নীতি নিয়ে জেল সুপারের বক্তব্য চাইলে তিনি তার বক্তব্য জানান নি।

প্রশ্ন উঠছে, আদালতের আদেশে একজন বন্দি যখন বৈধভাবে জামিন পান, তখন তার মুক্তির জন্য নির্ধারিত সরকারি ফি বা অন্যান্য আইনসঙ্গত খরচের বাইরে অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার সুযোগ কোথায়?

যদি কোনো বৈধ সরকারি ফি থাকে, তাহলে তার রসিদ থাকবে, নির্ধারিত হার থাকবে এবং অর্থ গ্রহণের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা থাকবে। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী ব্যক্তিভেদে ৮০০ টাকা, ৩ হাজার, ৭ হাজার কিংবা ১৯ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে এই অর্থের ভিত্তি কী? টাকা নেওয়া হলে তার রসিদ কোথায়? কার নির্দেশে নেওয়া হচ্ছে? আর এই অর্থ যাচ্ছে কোথায়?

আর যদি এসব অর্থ কোনো সরকারি নিয়মের আওতায় না পড়ে, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর। কারণ কারাগারের মতো একটি সংবেদনশীল প্রতিষ্ঠানে বন্দিদের অসহায়ত্বকে কাজে লাগিয়ে অর্থ আদায়ের অভিযোগ শুধু আর্থিক অনিয়ম নয়, ক্ষমতার অপব্যবহারেরও ইঙ্গিত দিতে পারে।

অনুসন্ধানে পাওয়া অভিযোগগুলোর মধ্যে বিকাশের মাধ্যমে টাকা নেওয়ার বিষয়টিও বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। কারাগারের কোনো বৈধ সরকারি পাওনা থাকলে সেটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস নম্বরে কেন নেওয়া হবে এ প্রশ্নের উত্তরও প্রয়োজন।

একজন বন্দি বা তার পরিবারের কাছ থেকে বিকাশে টাকা নেওয়া হয়ে থাকলে সেই লেনদেনের ডিজিটাল রেকর্ড থাকার কথা। ফলে তদন্তকারী সংস্থাগুলো চাইলে সংশ্লিষ্ট নম্বরের লেনদেনের তথ্য, কল রেকর্ড এবং টাকা পাঠানোর সময়ের সঙ্গে বন্দির মুক্তির সময় মিলিয়ে দেখলেই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা সম্ভব।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কারাগার নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এটিই প্রথম নয়। এর আগে কারাগারের অভ্যন্তরে বন্দিদের সঙ্গে আচরণ, খাবারের মান, ক্যান্টিন, চিকিৎসা, বন্দিদের বিভিন্ন সুবিধা এবং প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে।এবার মুক্তির সময় অর্থ নেওয়ার অভিযোগ সামনে আসায় কারাগারের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

একজন মানুষ যখন আদালতের আদেশে জামিন পান কিংবা তার কারাদণ্ডের মেয়াদ শেষ হয়, তখন তার মুক্তি পাওয়ার অধিকার একটি আইনগত প্রক্রিয়ার অংশ। সেই প্রক্রিয়াকে যদি অর্থ আদায়ের সুযোগ হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে সেটি বন্দি ও তার পরিবারের ওপর দ্বৈত চাপ তৈরি করে। একদিকে তারা মামলা পরিচালনার ব্যয় বহন করেন, অন্যদিকে মুক্তির মুহূর্তেও যদি অতিরিক্ত অর্থের দাবি আসে, তাহলে পুরো ব্যবস্থাটিই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।

অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে বিষয়টি কেবল মৌখিক অভিযোগ হিসেবে রেখে দিলে চলবে না। কারাগারের ভর্তি ও মুক্তি শাখায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ভূমিকা, মুক্তিপ্রাপ্ত বন্দিদের তালিকা, তাদের মুক্তির তারিখ, সংশ্লিষ্ট সময়ের সিসিটিভি ফুটেজ, দর্শনার্থী ও প্রবেশের রেকর্ড এবং অভিযোগে উল্লিখিত মোবাইল নম্বরের আর্থিক লেনদেন খতিয়ে দেখা জরুরি।

বিশেষ করে যাদের কাছ থেকে ৩ হাজার, ৭ হাজার কিংবা ১৯ হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে, তাদের সঙ্গে স্বাধীনভাবে কথা বলে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা যেতে পারে। একই সঙ্গে অভিযুক্ত কারারক্ষী এবং কারা কর্তৃপক্ষের বক্তব্য নেওয়াও অপরিহার্য।

কারাগার কোনো ব্যক্তিগত প্রতিষ্ঠান নয়। এখানে বন্দিদের স্বাধীনতা সীমিত থাকলেও তাদের আইনগত অধিকার সীমিত হয়ে যায় না। আদালতের আদেশে মুক্তি পাওয়া একজন বন্দির কাছ থেকে যদি ভয় দেখিয়ে বা কোনো অজুহাতে অর্থ আদায়ের ঘটনা সত্য প্রমাণিত হয়, তাহলে এটি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি পুরো মুক্তি প্রক্রিয়ায় জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি রাখে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন, একজন বন্দি মুক্তি পাওয়ার পর পরিবারের কাছে ফিরবেন, নাকি মুক্তির দরজায় দাঁড়িয়েও তাকে দিতে হবে ‘অঘোষিত টাকা’?

এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রয়োজন নিরপেক্ষ ও কার্যকর তদন্ত। অভিযোগের সত্যতা বেরিয়ে আসুক, দোষী হলে ব্যবস্থা হোক, আর অভিযোগ মিথ্যা হলে সেটিও তদন্তের মাধ্যমে পরিষ্কার হোক। কারণ কারাগারের মতো প্রতিষ্ঠানের প্রতি মানুষের আস্থা টিকিয়ে রাখতে হলে অভিযোগ চাপা নয়, বরং স্বচ্ছ তদন্তই সবচেয়ে জরুরি।

চলবে…

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array