Tepantor

দুই বছর পর প্রকাশ্যে শোভন, পাল্টাপাল্টি হুমকি-তবে কি ফের সক্রিয় হচ্ছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার ছাত্রলীগ?

24 August, 2026 : 10:15 pm

সীমান্ত খোকন:

আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রায় দুই বছর অনেকটা আড়ালে থাকা নিষিদ্ধ সংগঠন ছাত্রলীগের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক শাহাদাৎ হোসেন শোভনের প্রকাশ্যে আসা ঘিরে স্থানীয় রাজনীতিতে নতুন করে নানা প্রশ্ন উঠেছে। নৌপথে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তার উপস্থিতির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর শুধু শোভনের অবস্থান নিয়েই আলোচনা হচ্ছে না; বরং দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করছেন কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এসেছে।

এর মধ্যেই শোভনকে উদ্দেশ করে জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সমীর চক্রবর্তীর ‘সামনাসামনি একদিন খেলবো’ মন্তব্য এবং এর জবাবে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেলের পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তুলেছে।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, ঘটনাটি আপাতদৃষ্টিতে কয়েকজন নেতার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য হলেও এর রাজনৈতিক তাৎপর্য আরও বিস্তৃত। কারণ, আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর যে ছাত্রলীগের দৃশ্যমান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড কার্যত থেমে গিয়েছিল, সেই সংগঠনের জেলা পর্যায়ের শীর্ষ দুই নেতার নাম আবার একই সময়ে প্রকাশ্যে আসছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে বিএনপির ছাত্রসংগঠন ছাত্রদলের নেতাদের প্রকাশ্য প্রতিক্রিয়া। ফলে বিষয়টি কেবল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের উত্তাপের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি মাঠের রাজনীতিতেও এর প্রভাব পড়বে-সেটিই এখন দেখার বিষয়।

সম্প্রতি ‘ছাত্রনেতা শাহাদাৎ হোসেন শোভন ভাই’ নামের একটি ফেসবুক আইডি থেকে ‘আজ শহরে রাজা এসেছে!’ এবং ‘শহরে আজ রাজা এসেছিলো’ শিরোনামে একাধিক ভিডিও প্রকাশ করা হয়। ভিডিওতে শোভনকে স্পিডবোটে হাত নেড়ে অভিবাদন জানাতে এবং নৌযানে থাকা কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে করমর্দন করতে দেখা যায়।

গোয়েন্দা সূত্রের বরাতে জানা গেছে, ভিডিওতে দেখা নৌকার স্থান ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দত্তখলা এলাকা। এছাড়া ১৫ আগস্টের একটি কর্মসূচির ভিডিও মনিপুর এলাকায় ধারণ করা হয়েছে বলেও জানা গেছে।

২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর শোভন কোথায় ছিলেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে নানা আলোচনা ছিল। কখনো ভারত, কখনো নেপাল, সৌদি আরব কিংবা মালয়েশিয়ায় তার অবস্থানের গুঞ্জন শোনা গেলেও এসব বিষয়ে শোভনের পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

দীর্ঘ সময় পর তার এমন প্রকাশ্য উপস্থিতি এবং কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে নৌযানে অবস্থানের ভিডিও প্রকাশের ঘটনাই এখন নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে, শোভন কি শুধুই ব্যক্তিগতভাবে প্রকাশ্যে এসেছেন, নাকি এর পেছনে কোনো সাংগঠনিক বার্তা রয়েছে?

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভিডিওগুলো ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজরেও এসেছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ওবায়দুর রহমান জানিয়েছেন, ভিডিওগুলো দেখার পর পুলিশ বিষয়টি নিয়ে কাজ শুরু করেছে।

তবে শোভনের প্রকাশ্য উপস্থিতির পেছনে সাংগঠনিক কোনো পরিকল্পনা রয়েছে কি না, ভিডিওতে থাকা ব্যক্তিরা কারা এবং কোথায় কী ধরনের কর্মসূচি হয়েছে, এসব বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে এখনো বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।

শোভনের প্রকাশ্যে আসার ঘটনাকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক উত্তেজনা আরও বাড়ে জেলা ছাত্রদলের সদস্য সচিব সমীর চক্রবর্তীর একটি ফেসবুক স্ট্যাটাসে।

রোববার (২৩ আগস্ট) নিজের ফেসবুক অ্যাকাউন্টে সমীর লেখেন, ‘আশুগঞ্জের চরে খালে বিলে প্রোগ্রাম করেই এই অবস্থা—তারিখ, সময়, স্থান নির্ধারিত করে এসো, সামনাসামনি একদিন খেলবো।’

সমীরের এই বক্তব্যের পর পাল্টা প্রতিক্রিয়া জানান নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের জেলা সভাপতি রবিউল হোসেন রুবেল। তিনি লেখেন, ‘হুমকি দেন দাদা, আপনার ক্ষমতা সম্পর্কে ধারণা সবার আছে। তারিখ, সময় যখন নির্ধারণ করব, তখন তোমাকে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সীমানায় তো দূরের কথা, কিশোরগঞ্জের হাওরেও খুঁজে পাব না।’

দুই নেতার এমন পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে দুই পক্ষের ভাষায় সরাসরি মুখোমুখি হওয়ার ইঙ্গিত থাকায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।

শোভনের প্রকাশ্যে আসার ঘটনাটির রাজনৈতিক গুরুত্ব এখানেই যে, এটি ঘটছে এমন এক সময়ে যখন আওয়ামী লীগ ও তার সহযোগী সংগঠনগুলোর রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা চলছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা ছাত্রলীগের নেতৃত্বে শোভন ও রুবেল নতুন কোনো নাম নয়। ২০১৮ সালে কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সিদ্ধান্তে রবিউল হোসেন রুবেলকে সভাপতি এবং শাহাদাৎ হোসেন শোভনকে সাধারণ সম্পাদক করে জেলা কমিটি গঠন করা হয়েছিল।

অর্থাৎ এখন যে দুই নেতা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরস্পরের বক্তব্যের জবাব দিচ্ছেন, তারা একই কমিটির সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ফলে তাদের সাম্প্রতিক তৎপরতাকে বিচ্ছিন্ন ঘটনা হিসেবে দেখার পাশাপাশি সংগঠনের পুরোনো নেতৃত্ব ও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ পুনঃস্থাপনের সম্ভাবনাও রাজনৈতিক মহলে আলোচনায় আসছে।

তবে কয়েকটি ভিডিও বা নেতাদের ফেসবুক স্ট্যাটাসের ভিত্তিতে ছাত্রলীগ সাংগঠনিকভাবে পুরোপুরি সক্রিয় হয়ে গেছে, এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার সুযোগ নেই। বরং এসব ঘটনাকে সংগঠনটির নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে আত্মবিশ্বাস বা প্রকাশ্যে আসার প্রবণতার সম্ভাব্য ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন অনেকে।

এর সঙ্গে জাতীয় রাজনীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাও সামনে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা নতুন করে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিয়ে রাজনৈতিক আলোচনা তৈরি করেছে। তাঁর সম্ভাব্য প্রত্যাবর্তনকে কেন্দ্র করে বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, এতে সমর্থক ও বিরোধী, দুই পক্ষই নতুন করে সক্রিয় হতে পারে এবং রাজনৈতিক উত্তেজনাও বাড়তে পারে।

এমন পরিস্থিতিতে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা যদি প্রকাশ্যে আসতে শুরু করেন, তাহলে স্থানীয় রাজনীতিতেও তার প্রতিফলন ঘটতে পারে। ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় শোভনের প্রকাশ্যে আসা এবং পরপরই ছাত্রদল নেতার চ্যালেঞ্জ ও ছাত্রলীগ সভাপতির পাল্টা বক্তব্য সেই বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিবর্তনের একটি স্থানীয় প্রতিচ্ছবি কি না এ প্রশ্নই এখন সামনে।

অবশ্য শোভনের প্রকাশ্যে আসার সঙ্গে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণার কোনো সম্পর্ক নেই।  তাই দুই ঘটনাকে সরাসরি একই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে দেখারও সুযোগ নেই। তবে একই সময়ে আওয়ামী লীগপন্থী রাজনীতির ভবিষ্যৎ নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা এবং স্থানীয় পর্যায়ে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের নেতাদের দৃশ্যমান হওয়ার ঘটনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ।

শোভনের প্রকাশ্য উপস্থিতি এবং তাকে ঘিরে ছাত্রদলের প্রতিক্রিয়া ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে কয়েকটি সম্ভাব্য প্রভাব ফেলতে পারে।

প্রথমত, দীর্ঘদিন আড়ালে থাকা আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের মধ্যে নতুন করে প্রকাশ্যে আসার সাহস তৈরি হতে পারে। দ্বিতীয়ত, এর প্রতিক্রিয়ায় বিএনপি ও ছাত্রদলের নেতাকর্মীরাও মাঠে নিজেদের অবস্থান জানান দেওয়ার চেষ্টা করতে পারেন। তৃতীয়ত, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যদি মাঠের কর্মসূচি বা মুখোমুখি অবস্থানে রূপ নেয়, তাহলে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।

আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে ছাত্রসংগঠনগুলোর প্রভাব বরাবরই দৃশ্যমান। ফলে ছাত্রলীগের পুরোনো নেতাদের কোনো ধরনের সংগঠিত তৎপরতা শুরু হলে তার প্রতিক্রিয়া শুধু ছাত্র রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ নাও থাকতে পারে; মূলধারার দলীয় রাজনীতিতেও তার প্রভাব পড়তে পারে।

এখন পর্যন্ত অবশ্য শোভন বা রুবেলের পক্ষ থেকে নতুন কোনো আনুষ্ঠানিক সাংগঠনিক কর্মসূচির ঘোষণা পাওয়া যায়নি। ফলে তারা আসলে নতুন করে সংগঠন গোছাচ্ছেন, নাকি দীর্ঘদিন পর নিজেদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছেন—তার উত্তর মিলবে আগামী দিনের কর্মকাণ্ডে।

দুই বছর পর শোভনের প্রকাশ্যে আসা, নৌপথে কর্মী-সমর্থকদের সঙ্গে তার উপস্থিতি, ১৫ আগস্টের কর্মসূচির ভিডিও, পুলিশের নজরদারি এবং এরপর ছাত্রদল ও ছাত্রলীগ নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য-সব মিলিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে নতুন একটি অধ্যায়ের ইঙ্গিত দেখা যাচ্ছে।

জাতীয় পর্যায়ে শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণা এবং আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক ভূমিকা নিয়ে যখন নতুন করে আলোচনা চলছে, তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি জেলায় ছাত্রলীগের পরিচিত নেতৃত্বের প্রকাশ্যে আসা স্বাভাবিকভাবেই রাজনৈতিক মহলের নজর কাড়ছে।

তবে এই তৎপরতা শেষ পর্যন্ত সাংগঠনিক পুনর্গঠনে গড়াবে, নাকি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বক্তব্য ও বিচ্ছিন্ন উপস্থিতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে-সেটিই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। একই সঙ্গে দুই পক্ষের নেতাদের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য যেন মাঠের সংঘাতে রূপ না নেয়, সেদিকেও নজর থাকবে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার রাজনীতিতে আপাতত তাই সবচেয়ে বড় প্রশ্ন-দুই বছর পর শোভনের প্রকাশ্যে আসা কি শুধুই একজন নেতার ফিরে আসা, নাকি নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়া একটি রাজনৈতিক শক্তির আবারও দৃশ্যমান হওয়ার শুরু?

 

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array