
তেপান্তর রিপোর্ট: চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ না দেয়ায় ধর্ষণ মামলার তদন্তে কালক্ষেপণ এবং আসামি পক্ষের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের সঙ্গে দহরম মহরম সম্পর্ক রাখার অভিযোগ উঠেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার “পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন”(পিবিআই) এর এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্ত পিবিআই কর্মকর্তার নাম কামরুল হাসান।তিনি জেলা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের পুলিশ পরিদর্শক। উক্ত পুলিশ পরিদর্শকের বিরুদ্ধে আইজিপি কমপ্লেইন সেলে এবং পিবিআই-এর চট্টগ্রাম বিভাগের ডিআইজি বরাবর ইমেইলের মাধ্যমে অভিযোগ করেছেন ধর্ষিতা তরুণীর মা ও ধর্ষণ মামলার বাদী বিজয়নগর উপজেলার কাঞ্চনপুর গ্রামের বাসিন্দা মোছেনা খাতুন।
অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়,গত ১৫ মে ২০২৩ ইং তারিখে বিজয়নগরের মোছেনা খাতুন তার ১৬ বছর বয়সী নাবালিকা মেয়ে তাসলিমা আক্তারকে জোর পূর্বক ধর্ষণের ঘটনায় প্রতিবেশী মাসুম নামের এক বখাটের বিরুদ্ধে ব্রাহ্মণবাড়িয়া নারী ও শিশু দমন নির্যাতন ট্রাইবুনাল-৩ এ একটি ধর্ষণ মামলা দায়ের করেন। বিজ্ঞ আদালত মামলাটি প্রাথমিকভাবে আমলে নিয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে অধিকতর তদন্ত করে ১৩ই জুন ২০২৩ তারিখের মধ্যে আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেন।মামলা নং- পি১১৩/২৩। মামলাটি তদন্তের দায়িত্ব পান ব্রাহ্মনবাড়িয়া পিবিআই এর পরিদর্শক কামরুল হাসান। দায়িত্ব পেয়ে প্রথম যেদিন তিনি তদন্তে যান সেদিন বাদী পক্ষের কাছ থেকে ২৫০০ টাকা যাতায়াতের খরচ বাবদ নিয়ে আসেন।এর কিছু দিন পরে তিনি পুনরায় তদন্তে গিয়ে বাদীর সঙ্গে দেখা করে পার্শ্ববর্তী আসামিপক্ষের বাড়িতে যান। আসামির বাড়িতে তিনি এবং তার সহকর্মী দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ করে আসামি পক্ষের কাছ থেকে হাসিমুখে বিদায় গ্রহণ করেন। আসার সময় আসামি পক্ষের কাছ থেকে স্থানীয় সিএনজি চালক রাসেল মিয়ার সিএনজি বোঝাই করে কাঠাল,লিচু, জাম ও বিভিন্ন মৌসুমি ফল উপহার হিসেবে নিয়ে আসেন। মামলার বাদী মোসেনা খাতুন পিবিআই কর্মকর্তার কাছে আসামির বাড়িতে খাওয়া দাওয়া উচিত হয়েছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বাদীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার করেন এবং খালি কথায় চিড়ে ভিজে না বলে জানান। বাদী তার কাছে হাসপাতাল থেকে ভিকটিমের মেডিকেল রিপোর্ট পেয়েছেন কি-না এবং তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে কবে জমা দিবেন জিজ্ঞেস করলে তিনি বাদীকে পরদিন ভাদুঘরস্থ পিবিআই অফিসে দেখা করার কথা বলেন। স্বামী বিকলাঙ্গ ও হতদরিদ্র হওয়া স্বত্বেও ন্যায়বিচার পাওয়ার আশায় বাদী মোছেনা খাতুন গাছের কয়েকটি কাঠাল এবং সুদের উপর ১০ হাজার টাকা কর্জ নিয়ে পরদিন ভাদুঘর পিবিআই অফিসে দেখা করতে যান। এসময় বাদীর সঙ্গে ছিলেন তার ভাগ্নী মর্জিনা, বোন জামাই মিজান,প্রতিবেশী বিল্লাল এবং ধর্ষণের শিকার তার মেয়ে তাসলিমা আক্তার। বাদী মোছেনা খাতুন সকলের উপস্থিতিতে পিবিআই কর্মকর্তা কামরুলকে ১০ হাজার টাকা দিয়ে প্রতিবেদনটা দ্রুত আদালতে জমা দেয়ার অনুরোধ করলে কামরুল বলেন, এইসব মামলার রিপোর্ট অনেক ঝামেলা, ১০ হাজার টাকায় কিছুই হবে না। বাদী তদন্ত কর্মকর্তার কাছে তার অসহায়ত্বের কথা বিস্তারিত বলে রিপোর্টটি যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আদালতে পাঠানোর মিনতি করে চলে আসেন। কিন্তু এক মাস পেরিয়ে গেলেও যখন তিনি রিপোর্ট আদালতে দেননি তখন বাদী তার কাছে ফোন করে রিপোর্টের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চান। তদন্ত কর্মকর্তা কামরুল তখন উল্টো বাদীকে জিজ্ঞেস করেন তারা কী চান।
কামরুল বাদীকে বলেন,’ছেলের (আসামি মাসুম) সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, সে তোমার মেয়ে (ধর্ষিতা তাসলিমা)-কে বিয়ে করবে না। তুমি বরং এটি আপোষ করে ফেলো।’ বাদী তাকে বলেন,’ আমরা তো আপনাকে বিয়ের কথা বলিনি। আমরা আসামির শাস্তি চাই। আপনি ডাক্তারি রিপোর্ট পেয়েছেন কি-না এবং আদালতে প্রতিবেদন কবে জমা দিবেন সেটা বলেন।’ তখন তিনি ডাক্তারি রিপোর্ট পাননি এবং তার বড়ো স্যার ছুটিতে গেছেন,তিনি ছুটি থেকে ফিরে অফিসে জয়েন করলে তার সাক্ষর নিয়ে রিপোর্ট পাঠিয়ে দিবেন বলে জানান। এর কিছু দিন পর তিনি রিপোর্ট চট্টগ্রাম পাঠাতে হবে,সেখান থেকে রিপোর্ট সাইন হয়ে আসলে আদালতে জমা দিবেন এবং রিপোর্ট চট্টগ্রাম পাঠানোর খরচ হিসেবে বাদীর কাছ থেকে ৫ হাজার টাকা নেন। এরপর আরও চার সপ্তাহ কেটে গেছে। বাদীর স্বামী প্যারালাইজড এবং বাদী সহায় সম্বলহীন জেনেও পিবিআই কর্মকর্তা কামরুল বাদীর কাছ থেকে সর্বমোট সাড়ে সতেরো হাজার টাকা নেন।
অভিযোগপত্রটিতে আরও উল্লেখ্য রয়েছে,তদন্ত কর্মকর্তা আদালতে রিপোর্ট জমা না দিয়ে রাত বিরাতে বাদীর মোবাইলে কল দিয়ে আপোষের জন্য চাপ দিচ্ছেন। গত চার-পাচ দিন আগেও তিনি রাত সাড়ে দশটায় বাদীর ০১৭৯২-২৭০৫০৫ নাম্বারে ফোন দিয়ে কেমন আছেন জানতে চান। বাদী রিপোর্টের ব্যপারে জিজ্ঞেস করতেই তিনি এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করলে বাদী রাগ দেখিয়ে ফোন কেটে দেন।
অভিযোগপত্রে আরও লেখা আছে, মামলার আসামিপক্ষ বিত্তশালী ও বাদীর প্রতিবেশী হওয়ায়,তারা প্রতিদিনই ভিকটিম ও তার পরিবারকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলেন,পিবিআই-এর অফিসারকে ১ লাখ টাকা দিয়ে মামলা খেয়ে ফেলছি,মামলা মোকদ্দমা দিয়ে কিছুই করতে পারবা না।
এসব ঘটনায় ধর্ষণের শিকার তরুণী ও তার পরিবারের সদস্যরা ভয়াবহ হয়রানি ও মানসিক যন্ত্রণাতে ভুগছেন এবং ন্যায় বিচার থেকে বঞ্চিত হবার আশঙ্কা করছেন বলে জানা যায়। মামলার বাদী উভয় ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে আদালতে বস্তুনিষ্ঠ প্রতিবেদন এবং অভিযুক্ত পিবিআই কর্মকর্তা কামরুল হাসানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য পুলিশ সুপারের কাছে দাবি জানিয়েছেন।
অভিযুক্ত পিবিআই কর্মকর্তা কামরুল হাসানের কাছে মুঠোফোনে সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে ধর্ষণ মামলার ঘটনা সংক্রান্ত বিষয়ে কথা বলতে চাইলে তিনি ছুটিতে রয়েছেন এবং মোবাইলে কোন বক্তব্য দিতে পারবেন না,তাই তিন দিন পরে পিবিআই অফিসে গিয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে বলেন। পিবিআই অফিসে সরাসরি সাক্ষাৎ হলে,আসামির বাড়িতে দুপুরে খাওয়া দাওয়া করার কথা স্বীকার করেন এবং বাদীপক্ষ তাকে স্বেচ্ছায় কাঠাল দিয়েছিলেন বলেই তিনি নিয়েছিলেন বলে জানান। কিন্তু বাদী পক্ষের কাছ থেকে সাড়ে সতেরো হাজার টাকা নেয়ার বিষয়টি কৌশলে এড়িয়ে যান।
বাদীপক্ষ নিরক্ষর ও অবিভাবকহীন হওয়ায় মামলা সম্পর্কে তেমন বুঝেন না বলে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন।বাদীপক্ষ ঠিকঠাক ভাবে সহযোগিতা না করাতেই প্রতিবেদন দিতে দেরী হচ্ছে বলেও জানান কামরুল।
তাসলিমা আক্তারের প্রাথমিক ডাক্তারি প্রতিবেদনে ধর্ষণের আলামত পাওয়া গেলে বা না গেলেও তদন্ত প্রতিবেদন কেন দিচ্ছেন না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘কিছু মামলার প্রতিবেদন দশ দিনেই দিয়ে দেই আবার অনেক মামলার প্রতিবেদন দশ মাসেও দেয়া যায় না। শুধু পিবিআই না,থানার পুলিশ, ডিবি এবং সিআইডি-ও মাঝেমধ্যে এমন বিলম্ব করে থাকে। আমার প্রতি বাদীর অসন্তোষ থাকলে এসপি স্যারকে বলেন,আমি দায়িত্ব অন্য অফিসারকে বুঝিয়ে দেই।’ তার বিরুদ্ধে দায়েরকৃত অভিযোগের বিষয়ে অফিসিয়ালি কিছু জানেন না,তাই এ ব্যাপারে কোন কিছু জানার থাকলে প্রতিবেদককে তিনি উর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলতে বলেন।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics