মোস্তাফিজ চৌধুরী ও কাজী আশরাফুল ইসলাম: বাংলাদেশের বিদ্যমান আইনে জাতীয় মহাসড়কগুলোতে অযান্ত্রিক যানবাহন,থ্রি হুইলার ও সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল নিষিদ্ধ হলেও ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া দুই জাতীয় মহাসড়ক যেন এর ব্যতিক্রম। ফলে মৃত্যু থামছে না মহাসড়কে।উচ্চ আদালতের নিষেধাজ্ঞা থাকলেও দেশের প্রধান মহাসড়কগুলোতে প্রায় অবাধে চলছে তিন চাকার বিভিন্ন যানবাহন। এসব বাহনের কারণে মহাসড়কে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক ও অন্যান্য যানবাহন স্বাভাবিক গতিতে চলতে পারছে না। ফলে সৃষ্টি হচ্ছে যানজট, ঘটছে দুর্ঘটনাও। যার প্রমাণ মিলে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে এবং কুমিল্লা সিলেট আঞ্চলিক মহাসড়কে।
জানা যায়,একটি বিশেষ মহলকে ম্যানেজ করে এই দুই মহাসড়কে প্রতিদিন সহস্রাধিক নিষিদ্ধ সিএনজি চালিত অটোরিকশা চলাচল করছে। অভিযোগ রয়েছে সরাইল বিশ্বরোড মোড়স্থ খাটিহাতা হাইওয়ে পুলিশ ফাড়ির কতিপয় অসাধু পুলিশকে ‘মানতি’ নামক বিশেষ মাসোহারা দিয়ে ঢাকা- সিলেট এবং সিলেট – কুমিল্লা মহাসড়কের অন্তর্গত খাটিহাতা বিশ্বরোড মোড় থেকে আশুগঞ্জ, বিশ্বরোড মোড় থেকে মেড্ডা – কাউতলী, বিশ্বরোড মোড় থেকে চান্দুরা – মাধবপুর রোডে শতাধিক সিএনজি নিয়মিত যাত্রী পরিবহণ করছে। যার ফলে মহাসড়ক দুটিতে দূরপাল্লার দ্রুতগামী বাস-ট্রাকসহ বিভিন্ন ভারি যানবাহনের ধাক্কায় সিএনজি চালিত ও ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা দূর্ঘটনার শিকার হওয়া এখন নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।
এসব দূর্ঘটনায় সিএনজি যাত্রীদের মৃত্যুর সংখ্যা আশংকাজনক ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়,আশুগঞ্জ থেকে শুরু হয়ে বিজয়নগরের সাতবর্গ পর্যন্ত ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৩৪ কিলোমিটার এবং বিশ্বরোড থেকে কসবার কুটি পর্যন্ত কুমিল্লা-সিলেট মহাসড়কের প্রায় ৪০ কিলোমিটার সড়কে সিএনজিচালিত অটোরিকশাসহ অবৈধ যানের বেশ দাপট। অবৈধ যানের মধ্যে রয়েছে তিন চাকার ব্যাটারিচালিত ইজি বাইক, পায়ে ও মোটরচালিত রিকশা, ভটভটি, টেম্পো, সিএনজিচালিত অটোরিকশা প্রভৃতি।
তিন চাকার যানের কারণে দেশে সড়ক দুর্ঘটনা বাড়ছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের (এআরআই) তথ্য বলছে, দিন দিন পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ হয়ে উঠছে যে তিন চাকার যানবাহনের দুর্ঘটনার সংখ্যা ২০২০ সালের তুলনায় ২০২১ সালে তিন গুণ ,২০২০ সালের তুলনায় ২০২২ ও ২০২৩ সালে চারগুণ বেড়েছে।তবে এত কিছুর পরও মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচল বন্ধ করা যায়নি। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে তিন চাকার যানবাহন চলাচল বন্ধের দাবিতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বিক্ষোভ মিছিল ও মহাসড়ক অবরোধও করেছে বাস মালিক-শ্রমিকরা। গত ১ জুলাই ২০২০ ইং সকাল সোয়া ১০টা থেকে বেলা পৌনে ১১টা পর্যন্ত ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল-বিশ্বরোড় মোড়ে এ কর্মসূচি পালন করেন মালিক-শ্রমিকরা। এমনকি সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সড়ক দূর্ঘটনায় মৃত্যুর হার কমাতে বর্তমান সরকার ২০১৫ সালে দেশের ২২টি মহাসড়কে তিন চাকার যান চলাচলে নিষেধাজ্ঞা দেয়। এরপর হাইকোর্ট ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে দেশের সব প্রধান মহাসড়কে তিন চাকার যান না চালানোর আদেশ দিয়ে সেই নিষেধাজ্ঞা আরো জোরদার করেন। সর্বশেষ গত ৪ এপ্রিল ২০২২ ইং এক রিট আবেদনের শুনানি নিয়ে সর্বোচ্চ আদালত এক আদেশে বলেন, ব্যাটারিচালিত তিন চাকার যান মহাসড়কে উঠতে পারবে না।
আলোচিত সিএনজি রুটসমূহ জাতীয় মহাসড়ক এন ১০২- ময়নামতি (কুমিল্লা) – ব্রাহ্মণবাড়িয়া বাইপাস – সরাইল এবং জাতীয় মহাসড়ক এন ২ – ভৈরব – সরাইল – মাধবপুর এর অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ সরকার কর্তৃক নিষেধাজ্ঞার আওতায় থাকা ২২ টি মহাসড়কের মধ্যে উল্লেখিত সড়ক সমূহও রয়েছে। সেক্ষেত্রে এসব সড়কে থ্রি হুইলার ও সিএনজি চলাচল সম্পূর্ণ বেআইনি। আইনের তোয়াক্কা না করায় এই দুই মহাসড়কে প্রতিনিয়ত বাস ও ট্রাক চাপায় সিএনজি আরোহীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। গত ২৮ শে জুন বুধবার ঢাকা – সিলেট মহাসড়কে বিজয়নগরের বুধন্তী এলাকায় বাসের নিচে চাপা পড়ে সিএনজি অটোরিকশার দুই যাত্রী নিহত এবং চার যাত্রী মারাত্মকভাবে আহত হয়। এর দু-দিন পর, ৩০ শে জুন শুক্রবার কুমিল্লা- সিলেট মহাসড়কে কসবার তিনলাখপীর এলাকায় বাসের ধাক্কায় সিএনজি উলটে গেলে এক যাত্রী ঘটনাস্থলেই মারা যায় এবং চারজন গুরুতর আহত হন। ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহাসড়কে সিএনজি দূর্ঘটনায় মৃত্যুর মিছিল প্রতিনিয়ত দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, কখনো দালালের মাধ্যমে আবার কখনো সরাসরি হাইওয়ে পুলিশকে বিশেষ মাসোহারা (মানতি) পরিশোধ করে এসব সিএনজি চলছে।অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের লক্ষ্যে সাংবাদিক পরিচয় গোপন করে এই প্রতিবেদক সাধারণ যাত্রীর ছদ্মবেশে বিশ্বরোড এলাকায় তিনদিন অবস্থান নিয়ে স্টিং অপারেশন চালায়।অনুসন্ধানে জানার চেষ্টা করা হয় উল্লেখিত মহাসড়ক দুটিতে সিএনজি চলাচলের জন্য কারা মূলত দায়ী? সিএনজি চালক,পুলিশ, দালাল,নাকি অসচেতন যাত্রী বৃন্দ? অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে আইন অমান্য করে ও পুলিশকে মাসোহারা দিয়ে মহাসড়কে চলাচলকারী একাধিক সিএনজি মালিকের চাঞ্চল্যকর কিছু নাম-পরিচয় ,যাদের মধ্যে রয়েছে কথিত সাংবাদিক,শ্রমিকলীগ নেতা,অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তিদের নাম পরিচয়। যার সুস্পষ্ট প্রমাণ রয়েছে প্রতিবেদকের কাছে।
এবিষয়ে জানতে খাটিহাতা হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা অকুল চন্দ্র বিশ্বাসের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন,আমি দায়িত্ব নেয়ার পর অনিয়মের কোন সুযোগ দিচ্ছি না,অভিযান অব্যাহতভাবে চলমান রয়েছে। সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি নিয়ন্ত্রণে রাখার।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics