Tepantor

আখাউড়ায় বছরে বছরে প্লাবন: দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় কোথায় ঘাটতি?

2 June, 2025 : 4:19 pm

সীমান্ত খোকন: টানা বৃষ্টিপাত আর ভারত থেকে আসা ঢলে আবারও পানির নিচে চলে গেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার অন্তত ২০টি গ্রাম। বসতঘর, সড়ক, স্থলবন্দর, রেলস্টেশন কোনো কিছুকেই ছাড়েনি এই পানি। পুরো উপজেলা যেন আবারও এক অনিয়ন্ত্রিত দুর্যোগের চিত্র। টানা তিন দিন বৃষ্টির পর ও ভারত থেকে আসা ঢলে গত ১ জুন আকস্মিক পানি বাড়তে শুরু করে।

এই দুর্যোগ নতুন কিছু নয়। ঠিক এক বছর আগেও, ২০২৪ সালের আগস্টে একই ধরনের ভয়াবহ বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছিল আখাউড়ায়। তখন প্লাবিত হয়েছিল ৪৭টিরও বেশি গ্রাম। আখাউড়া-আগরতলা সড়কের গাজীরবাজার সেতু ভেঙে পড়ে যোগাযোগ সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিল তখন। সীমান্তবর্তী বাণিজ্যিক গেট বন্ধ হয়ে পড়েছিল, ব্যাহত হয়েছিল আমদানি-রপ্তানি ও ইমিগ্রেশন কার্যক্রম। তারও আগের বছরগুলিতে একই ভাবে বন্যা হয়েছিলো বন্দর এলাকা আখাউড়ায়।

২০২৫ সালের বন্যা পরিস্থিতি:

এই বছরও একই ধরনের বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলের ফলে একই এলাকার মানুষ আবারও দুর্ভোগে পড়েছে। আখাউড়া রেলস্টেশনের প্ল্যাটফর্ম, যাত্রী ছাউনি, রেললাইনসহ আশপাশের এলাকায় পানি ঢুকে পড়েছে। পৌর শহরের মনিয়ন্দ রোড, উত্তর ইউনিয়নের দেবগ্রাম, কড়ইবাড়ি, দারোয়ানবাড়ি, আহম্মদপুর, দক্ষিণ ইউনিয়নের চানপুর, রাজাপুর, ধরখার ও খরমপুরসহ বেশ কয়েকটি গ্রামে পানিতে তলিয়ে গেছে শতাধিক বসতবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান।

প্রশাসনের প্রতিক্রিয়া:

আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জিএম রাশেদুল ইসলাম জানিয়েছেন,
“ভারী বৃষ্টির কারণে পাহাড়ি ঢল নেমে এসেছে। এতে বেশ কয়েকটি গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবেলায় উপজেলা প্রশাসন প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছে। বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণে রেখেছি।”
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ ভিন্ন। তাঁদের দাবি, প্রতিবছর একই জায়গায় একই ধরনের দুর্যোগ হলেও আগাম প্রস্তুতির অভাব এবং ড্রেনেজ ব্যবস্থার নাজুকতা আগের মতোই থেকে যাচ্ছে।

২০২৪ সালের বন্যা: এক ভয়াবহ স্মৃতি:

গত বছরের বন্যায় আখাউড়ার দক্ষিণ ইউনিয়নের কালিকাপুর, বীরচন্দ্রপুর, আব্দুল্লাহপুর ও বঙ্গেরচর গ্রামের বিস্তীর্ণ জমি, রাস্তাঘাট ও শতাধিক ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে গিয়েছিল। হাওড়া নদীর পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি উঠে গিয়েছিল। সার্বিকভাবে ১১টি জেলার প্রায় ৭৩টি উপজেলায় বন্যা দেখা দেয় এবং ৫ লাখেরও বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যেতে বাধ্য হয়।
ক্রমাগত কয়েক বছর একই এলাকায় একই সময়ে বন্যা দেখা দেওয়ার অর্থ হচ্ছে, এটি এখন একটি “ঋতুভিত্তিক দুর্যোগ” হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত। বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে এখন পাহাড়ি ঢলের আগমনও দ্রুত ও ব্যাপক হয়। ফলে পুরনো ড্রেনেজ ব্যবস্থা ও বাঁধ ব্যবস্থাপনা এতো চাপ নিতে পারে না।

 

তাই করণীয় হতে পারে:

আখাউড়ায় একটি দীর্ঘমেয়াদি জল নিষ্কাশন ও বন্যা প্রতিরোধ পরিকল্পনা গ্রহণ। প্রতিবছর বর্ষার আগে ড্রেন ও খালগুলো ড্রেজিং করা। পাহাড়ি ঢলের পূর্বাভাস নির্ভরযোগ্যভাবে সংগ্রহ করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। ঝুঁকিপূর্ণ গ্রামগুলোর জন্য বন্যা আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ ও আগাম সতর্কতা।
আখাউড়া শুধু একটি সীমান্ত উপজেলা নয়, এটি একটি বাণিজ্যিক প্রবেশদ্বারও। এখানে বছরে বছরে বন্যা হলে শুধুমাত্র মানুষের দুর্ভোগই বাড়ে না, স্থলবন্দর, রেল ও সড়ক যোগাযোগ এবং অর্থনীতিতেও মারাত্মক প্রভাব পড়ে। তাই ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে আছে’ এই মনোভাব থেকে বের হয়ে কার্যকর এবং সময়োপযোগী উদ্যোগ নেয়ার এখনই সময়।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array