
তেপান্তর রিপোর্ট: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার বিজয়নগর উপজেলার পাইকপাড়া গ্রামের এমরান ও রাসেলের বিরুদ্ধে আদম ব্যবসার নামে প্রতারণার মামলা দাযের করায় এবং তাদের আত্মীয় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে বাদী হয়ে মামলা করায় উপজেলা বিএনপি নেতা ও ঠিকাদার এস এম রাষ্টুকে মারধর করে গুরুতর আহত করার এবং তার বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দায়ের করার অভিযোগ উঠেছে।
প্রত্যক্ষদর্শী ও স্থানীয়দের সাথে কথা বলে এ অভিযোগের প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়,বিজয়নগর উপজেলা বিএনপি নেতা রাষ্টু সরকারের ভাতিজা পাইকপাড়া গ্রামের শাহানুর সরকারকে কফি হাউজে চাকরি দেয়ার কথা বলে প্রায় পাঁচ লাখ টাকার বিনিময়ে গত বছরের জানুয়ারি মাসের ৪ তারিখে সৌদি আরব নিয়ে যায় একই গ্রামের ইয়াকুব আলীর দুই ছেলে ইমরান মিয়া এবং রাসেল মিয়া। সৌদি আরবে পৌছার পর শাহানুরকে আল কাসিম শহরে নিয়ে যায় রাসেল মিয়া। তাকে কাজ না দিয়ে দুই তিন মাস ঘরে বসে আকামার জন্য অপেক্ষা করতে বলে, এবং বাসা থেকে বের হতে নিষেধ করে রাসেল মিয়া। কিন্তু এতে বিরোধীতা করে শাহানুর বলে,” আমি কাজের জন্য ধার-দেনা করে আসছি, কাজ না করে বসে থাকলে আমার বউ বাচ্চা না খেয়ে থাকবে, আমাকে দ্রুত কাজ দিন।” শাহনুরের প্রতিবাদী আচরণে রাসেল রেগে যায়। সে শাহানুরকে হুমকি দেয়, দুই তিন মাস অপেক্ষা না করলে তাকে মেরে পুলিশে দিয়ে দিবে। এরপর থেকে শাহনুর প্রায়ই মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে থাকে, তাকে সবসময়ই ভীতিকর অবস্থায় রাখা হতো, ঠিকঠাকভাবে খাবার দেয়া হতো না, এমনকি স্ত্রী, সন্তান পরিবার-পরিজনেদের সাথেও ঠিকভাবে যোগাযোগ করতে দেওয়া হতো না।
এসব বিষয় শাহানুরের স্ত্রী তাসলিমা বেগম তার চাচা রাষ্টু মিয়াকে জানালে তিনি ইমরান ও রাসেলকে শানুর সমস্যার সমাধান করার অনুরোধ জানান। কিন্তু ইমরান ও রাসেল রাষ্টু মিয়ার কথায় কর্ণপাত না করে, রাষ্টু মিয়া বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় উল্টো তাকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের প্রভাব প্রভাব খাটিয়ে মামলা হামলা সহ প্রশাসনিকভাবে হয়রানি করার হুমকি প্রদান করে। একাধিক মামলায় ইতিপূর্বে নিগৃহীত হওয়ায় রাষ্টু মিয়া ইমরান ও রাসেল মিয়াকে শাহানুরের সমস্যা সমাধানের পরামর্শ বা চাপ দেয়া বন্ধ করে দেয়। কারণ বিজয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী একাধিক নেতা ছিল তাদের ঘনিষ্ঠ আত্মীয়। এদিকে ছয় মাসেরও বেশি সময় ধরে বেকার থাকার পর মানসিকভাবে বিপর্যস্ত অবস্থায় এক প্রবাসী বাংলাদেশীর সহায়তায় শাহনুর মদিনা শরীফে আশ্রয় নেয়। কিন্তু আকামা না থাকায় শাহানুর অবৈধ প্রবাসী হয়ে যায়,যার ফলে তাকে কেউ কাজ দিতে চায়নি। দিনে দিনে রাষ্টু মিয়ার ভাতিজা শাহানুর হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং গত ২১’শে মার্চ একটি সড়ক দুর্ঘটনায় মৃত্যুবরণ করে । নির্মমভাবে মৃত্যুবরণ করলেও আকামা না থাকায় সৌদি আরব থেকে শাহানুর মিয়ার মৃত লাশটিও বাংলাদেশের মাটিতে এনে দাফন করা যায়নি। নিজ গ্রামের প্রতিবেশী হয়েও ইমরান ও রাসেলের দ্বারা প্রতারিত, নির্যাতিত ও অবহেলিত শাহানুরের মৃত লাশটিও একবারের মত ছুঁয়ে দেখতে পারেনি তার স্ত্রী, সন্তান ও আত্মীয় স্বজনরা। এলাকাবাসীর অভিযোগ একই গ্রামের হয়েও ইমরান ও রাসেল শাহানুরের সাথে প্রতারণা করেছে, তাকে মানসিকভাবে নির্যাতন করে হত্যা করেছে। এই অভিযোগে গত ৩ এপ্রিল বিজয়নগর থানায় মামলা দায়ের করে শাহানুরের স্ত্রী তাসলিমা বেগম। মামলা দায়েরের পর থেকেই ইমরান ও রাসেল আপোষ মীমাংসার জন্য শানুর স্ত্রী ও তার চাচা রাষ্টু সরকারকে হুমকি-ধামকি দিতে থাকে। কিন্তু রাষ্টু সরকার ও শানুর পরিবার মামলা প্রত্যাহার এবং আপোষ মীমাংসায় রাজি না হয়ে ন্যায় বিচারের অপেক্ষায় থাকে।
এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সাথে কথা বলে আরও জানা যায়, ২০১৮ সালে বিজয়নগরের নির্বাচনী প্রচারণায় জেলা বিএনপির বর্তমান সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খালেদ মাহবুব শ্যামলের গাড়িবহরে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনায় গত বছরের ২৭ শে আগষ্ট উপজেলা বিএনপি নেতা রাষ্টু সরকার বাদী হয়ে বিজয়নগর থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। মামলায় ইমরান ও রাসেলের অনেক নিকটাত্মীয় আওয়ামী লীগ নেতা কর্মীরাও আসামি হয়, যাদের প্রভাবে ইমরান ও রাসেল ইতিপূর্বে গ্রামে প্রভাব দেখাতো, রাষ্টু সরকারকে হুমকি দিত, মামলা প্রত্যাহার ও আপোষ মীমাংসের জন্য চাপ দিত। এ মামলা প্রত্যাহার করতেও রাষ্টুকে বারবার চাপ দিতে থাকে, রাষ্টুর ভাতিজার বউয়ের দেয়া মামলায় ইমরান ও রাসেল আসামি হওয়ায়় তারা আরো বেপরোয়া হয়ে যায়, রাষ্টুকে প্রাণনাশের হুমকি দিতে থাকে।
গত ৩১শে মে ইমরান মিয়া সৌদি আরব থেকে বাংলাদেশে আসলে ইমিগ্রেশন পুলিশ তাকে আটক করে বিজয়নগর থানায় হস্তান্তর করলে তাকে আদালতের মাধ্যমে জেল হাজতে পাঠানো হয়। পরবর্তীতে ২ জুন জামিনে বের হয়ে ইমরান তার সহযোগীদের নিয়ে রাষ্টু সরকারকে মেরে ফেলতে গোপন মিটিং করে বলে অভিযোগ পাওয়া যায় এবং সে মিটিংয়ে ইমরানকে গ্রেফতার করতে রাষ্টু মিয়া প্রভাব রেখেছেন বলে তারা দাবি করে, তাদের আওয়ামীপন্থী আত্মীয়স্বজনদের মিথ্যা মামলায় ফাঁসিয়েছেন বলে রাষ্টুকে শায়েস্তা করা জরুরি হয়েছে বলে তারা সিদ্ধান্ত নেয়।
প্রত্যক্ষদর্শী ও এলাকাবাসীর বর্ণনামতে, গত ঈদুল আযহা উপলক্ষে পাইকপাড়া বাজারে অস্থায়ী পশুর হাটের ইজারা নেন রাষ্টু সরকার। ৩ জুন বাজারে পশু বিক্রির হাসিল সংগ্রহ কাজের তদারকি করতে গেলে রাসেল ও তার দলবল রাষ্টু সরকারের উপর পূর্বপরিকল্পিতভাবে হত্যার উদ্দেশ্যে দেশীয় অস্ত্রশস্ত্রে সজ্জিত হয়ে হামলা করে। তাকে গুরুতর জখম ও আহত করা হয়, এবং হামলাকারীরা তার সাথে থাকা হাট ইজারারা তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায়। এ ঘটনায় পরদিন ৪ জুন রাসেল ও ইমরানসহ মোট চারজনের বিরুদ্ধে বিজয়নগর থানায় বাদী হয়ে মামলা করেন রাষ্টু সরকার। গোপন সূত্রে জানা যায়, ইতিমধ্যে এই মামলার অভিযোগপত্র দেয়া হয়েছে। পলাতক আসামি হয়েও রাষ্টু সরকারকে অবিরত মামলা প্রত্যাহারের জন্য হুমকি দিয়ে যাচ্ছে রাসেল, ইমরান ও তাদের সহযোগীরা। রাষ্টুকে মারধরের ঘটনার প্রায় একমাস পর একই ঘটনায় রাষ্টুর হামলায় আহত দাবি করে গত ২’ ই জুলাই উল্টো রাষ্টু সরকারসহ আরও কয়েকজনকে আসামি করে আদালতে দ্রুত বিচার আইনে মামলা করেছে ইমরান। এলাকাবাসী ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য অনুযায়ী রাষ্টু সরকারকে হয়রানি করতেই এই মিথ্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে।
অভিযুক্ত ইমরানের দাবি তিনি কিংবা তার ভাই রাসেল মিয়া শাহানুরকে সৌদি আরবে নেননি, শাহানুরকে নিয়ে তাদের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তিনি আরো বলেন, রাষ্টু মিয়ার দেয়া আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে দেয়া মামলা প্রত্যাহারে তিনি, তার ভাই কিংবা তার আত্মীয় স্বজন কেউ হুমকি বা চাপ প্রয়োগ করেনি। এ অভিযোগও সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
রাষ্টু সরকারের উপর হামলা ও মারধরের ঘটনার ব্যাপারে ইমরান বলেন, ” তিনি আমাদের উপরে হামলা করলে একটা মারধরের ঘটনা ঘটে। পরবর্তীতে কাসেম মেম্বারের নেতৃত্বে এলাকাবাসী আমাদেরকে কোন আইনগত ব্যবস্থা না নিতে অনুরোধ করেন। তারা আশ্বাস দেন, রাষ্টু যদি মামলাও করে তারা সেটা দেখবে, আপোষ মীমাংসার ব্যবস্থা করবে। কিন্তু রাষ্টু কারো কথা শোনেনি। সে মামলা দায়ের করে বিভিন্নভাবে আমাদেরকে হয়রানির চেষ্টা করতেছে।”
বিজয়নগর উপজেলা বিএনপি নেতা রাষ্টু সরকার বলেন,” ভাতিজার মৃত্যুর ঘটনায় দায়েরকৃত মামলায় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করায় আমার উপর ক্ষিপ্ত হয়ে রাসেল,ইমরান, আলামিন আমাকে হত্যার চেষ্টা করে। আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে আমি যে মামলা করেছি সেখানে তাদের কিছু আত্মীয় স্বজন আছে।সবকিছু মিলিয়ে আমাকে তারা রাস্তা থেকে সরিয়ে দিতে চাইছে।তারা আমাকে মেরেছে আমি মামলাও করেছি। অথচ ঘটনার একমাস পর ভূয়া ডাক্তারি স্লিপ বানিয়ে আমার বিরুদ্ধে আদালতে মিথ্যা দায়ের করেছে।তারা বিজয়নগরের বাসিন্দা হয়েও চিকিৎসা স্লিপ দিয়েছে সরাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের। আমার উপর হামলাকারী আলামীন সরাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ক্লিনারের চাকরি করে। সেখান থেকে ব্যাক ডেইট দিয়ে ভূয়া কাগজ বানিয়ে তারা এই মিথ্যা মামলা করেছে।”
রাষ্টু মিয়ার দেয়া মামলা এবং তাসলিমা বেগমের দেয়া মামলার তদন্ত কর্মকর্তা বিজয়নগর এসআই মাহবুবুর রহমান বলেন, ” রাষ্টু মিয়ার দায়ের করা মারধরের মামলার চার্জশিট ইতিমধ্যে আদালতে প্রেরণ করা হয়েছে, তাসলিমা বেগমের দেয়া মামলা এখনো তদন্তনাধীন আছে।”
শাহানুরকে সৌদি আরবে নেননি বলে ইমরান যে দাবি করেছেন সে ব্যাপারে এস আই মাহাবুব বলেন, ” প্রবাসে শানু মিয়ার মৃত্যুর পরপর সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ইমরান ও রাসেলের বিরুদ্ধে তাকে সৌদি আরব নিয়ে কাজ এবং আকামা না দিয়ে প্রতারণা ও হয়রানির অভিযোগে স্থানীয়রা পোস্ট দিয়েছে, এমনকি এলাকায় তদন্তে গিয়েও শাহানুরকে সৌদি আরব ইমরান ও তার ভাই রাসেল নিয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে জানতে পেরেছি। মামলাটি এখনো তদন্তনাধীন রয়েছে।”
এলাকাবাসীর দাবি একই গ্রামের বাসিন্দা হয়েও ইমরান ও রাসেল আদম ব্যবসার নামে যে নির্যাতন ও প্রতারণা শাহানুরের সাথে করেছে এবং রাষ্টু মিয়ার উপর হামলা করছে এতে তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হোক। শাহানুরের স্ত্রী, সন্তান ও পরিবার এবং রাষ্টু মিয়া ন্যায় বিচার পাবে বলেই তাদের প্রত্যাশা।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics