তেপান্তর রিপোর্ট:
ব্রাহ্মণবাড়িয়া বলতেই একসময় চোখের সামনে ভেসে উঠত এক আদিম ও গ্রামীণ সংঘাতের ছবি—যেখানে দুই পক্ষ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে হাতে তুলে নিত টেটা, বল্লম কিংবা লাঠি। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এই ‘টেটা-যুদ্ধ’ ছিল এ অঞ্চলের দীর্ঘদিনের এক নেতিবাচক পরিচিতি। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে পাল্টে গেছে এই সংঘাতের ধরন। লাঠিসোঁটা আর দেশীয় অস্ত্রের জায়গা দখল করেছে আধুনিক আগ্নেয়াস্ত্র। ‘টেটা-বল্লম’ সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে জেলাটি এখন ধাবিত হচ্ছে আরও ভয়াবহ ‘গুলির সংস্কৃতি’র দিকে। পান থেকে চুন খসলেই এখন গর্জে উঠছে বন্দুক।
গত কয়েক মাসের সহিংসতার চিত্র বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, জেলায় খুনের রাজনীতি ও সামাজিক দলাদলি এক চরম পর্যায়ে পৌঁছেছে। জেলা শহরের মুন্সেফ পাড়ায় পারিবারিক বিরোধের জেরে প্রকাশ্যে সাগর মিয়াকে গুলি করে হত্যা করা হয়। এর কিছুকাল আগেই কান্দিপাড়া এলাকায় রাতের অন্ধকারে গুলিতে প্রাণ হারান মোহাম্মদ সাদ্দাম মিয়া। সহিংসতার আঁচ থেকে মুক্ত নয় উপজেলাগুলোও। নবীনগরের কালীবাড়ি মোড়ে সাব্বির হোসেন নামে এক যুবককে লক্ষ্য করে গুলি চালানো হয়, যার ক্ষত বয়ে নিয়ে তাকে ছুটতে হয়েছে ঢাকা পর্যন্ত। ১ নভেম্বরের রাতটি ছিল আরও বিভীষিকাময়; নবীনগরে প্রতিপক্ষের ওপর নির্বিচারে গুলিবর্ষণে ঘটনাস্থলেই দুজন নিহত হন এবং বেশ কয়েকজন গুরুতর আহত হন।
বিশ্লেষকদের মতে, এই ভয়াবহ পরিবর্তনের পেছনে মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে রাজনৈতিক অস্থিরতা ও ক্ষমতার দাপট।
রাজনৈতিক ছত্রছায়া: স্থানীয় পর্যায়ে আধিপত্য বজায় রাখতে রাজনৈতিক প্রভাবশালীরা অনেক সময় অস্ত্রধারী ক্যাডারদের লালন-পালন করেন। যখনই ক্ষমতার হাতবদল হয় বা অভ্যন্তরীণ কোন্দল মাথাচাড়া দেয়, তখনই এই অস্ত্রগুলো ব্যবহৃত হয়।
বিচারহীনতার সংস্কৃতি: রাজনৈতিক প্রভাবে অনেক সময় অপরাধীরা পার পেয়ে যায়। ফলে সাধারণ অপরাধীরাও এখন আগ্নেয়াস্ত্র ব্যবহারে দ্বিধাবোধ করছে না।
অবৈধ অস্ত্রের প্রবেশদ্বার: সীমান্তবর্তী জেলা হওয়ায় অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্রের সহজলভ্যতা এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। স্থানীয় দলাদলিতে এখন আর পেশিশক্তির চেয়ে ‘অস্ত্রশক্তি’কে বেশি প্রাধান্য দেওয়া হচ্ছে।
সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, আগে টেটা-যুদ্ধে একটি নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় থাকত, দলবল নিয়ে লাড়াই করতে হতো এবং নিহতের সংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল। কিন্তু আগ্নেয়াস্ত্রের ব্যবহার সরাসরি প্রাণহানি নিশ্চিত করছে এবং এটি চুপিসারেই করা যাচ্ছে। এটি কেবল ব্যক্তিগত বা সামাজিক বিরোধ নয়, বরং জনমনে চরম আতঙ্ক সৃষ্টি করে পুরো আইনশৃঙ্খলার ছবি বদলে দিচ্ছে। তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে অস্ত্রের মহড়া এখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সাধারণ মানুষের নিত্যদিনের আতঙ্ক।
ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে এই মরণখেলা থেকে বাঁচাতে হলে প্রয়োজন কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ: ১. সাঁড়াশি অভিযান: প্রতিটি পাড়া-মহল্লা ও দুর্গম অঞ্চলে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারে নিয়মিত অভিযান চালানো। ২. রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি: রাজনৈতিক দলগুলোকে নিশ্চিত করতে হবে যে, কোনো অপরাধী বা অস্ত্রধারী তাদের আশ্রয় পাবে না। ৩. দ্রুত বিচার: চাঞ্চল্যকর এই হত্যাকাণ্ডগুলোর দ্রুত বিচার এবং অপরাধীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা। ৪. সামাজিক সচেতনতা: স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি ও জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে সংঘাত বিরোধী প্রচারণা জোরদার করা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শিল্প, সাহিত্য আর মেধার ভূমি। তিতাস বিধৌত এই জনপদে অস্ত্রের ঝনঝনানি দীর্ঘদিনের ঐতিহ্যকে ম্লান করে দিচ্ছে। প্রশাসন ও সুশীল সমাজ যদি এখনই সচেতন না হয়, তবে ‘টেটা-বল্লম’ থেকে ‘গুলি’র এই বিবর্তন জেলার ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে এক অন্ধকার গহ্বরে ঠেলে দেবে।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics