Tepantor

পুকুরখেকোরা খেয়ে ফেলছে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সব পুকুর

26 December, 2019 : 2:46 pm

ময়লা আর্বজনা ফেলে  আবার ভরাট করার চেষ্টা করা হচ্ছে বর্ডার বাজারের (মধ্যপাড়া) সেই পুকুর। ছবি: তেপান্তর

আসাদুজ্জামান আসাদ: একসময় ব্রাহ্মণবাড়িয়াকে ‘পুকুরের শহর’ বলা হতো। তবে এখন আর সেই অবস্থা নেই। ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলা মৎস অধিদপ্তরের হিসেবে ১৯৮৪ সালে ‘ব্রাহ্মণবাড়িয়া’ মহকুমা থেকে জেলা শহরে পরিণত হওয়ার পর থেকে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পৌর এলাকার অন্তত ১৫৩টি পুকুর ভরাট করে বাসা-বাড়ি ও বাণিজ্যিক ভবনসহ বিভিন্ন স্থাপনা তৈরি করা হয়েছে। এতে শহরটি এখন প্রায় পুকুর শূন্য হয়ে পড়ছে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মহিলা আওয়ামীলীগ এর সাধারণ সম্পাদক এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা পরিষদের সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান তাসলিমা সুলতানা খানম নিশাত বলেন  , সিন্ডিকেট সদস্যরা প্রথমে পুকুরের এক কিনারে আবর্জনা ফেলতে শুরু করে এবং এক পর্যায়ে যখন পুকুর বা জলাশয়টি তার কার্যকারিতা হারায় তখন তারা রাতের অন্ধকারে বালু ফেলে ভরাট কাজ শুরু করে। আক্ষেপের সুরে তিনি আরো বলেন, জেলা শহরে পরিণত হওয়ার পর থেকে গত ৩৫ বছরে এই শহরটিতে নির্বিচারে পুকুর হত্যা চলছে।

শহরের পূর্ব  মধ্যপাড়ার ইসকন মন্দিরের সামনের পুকুর, কান্দিপাড়ার আশিক প্লাজার পেছনের পুকুর, পাওয়ার হাউজ রোড সংলগ্ন রঘুনাথ জিউর আখড়ার পেছনের পুকুর, বণিক পাড়ার মন্ত্রী বাড়ির পুকুর, ছাবেরা সোবহান স্কুলের সামনের পুকুর, পাইকপাড়া এলাকার রাম ঠাকুর আশ্রমের পুকুর, দাসপাড়ার পুকুর, কালাইশ্রীপাড়ার লোকনাথ মন্দির সংলগ্ন পুকুর, পশ্চিম মেড্ডা এলাকার কাজীবাড়ির পুকুরসহ অনেক বড় বড় পুকুরই এখন ইতিহাসের অংশ। এই পুকুরগুলো ভরাট করে সেখানে বহুতল বাড়ি-এপার্টমেন্ট ছাড়াও বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। অপরিকল্পিত নগরায়ণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাবে প্রাকৃতিক জলাশয়গুলি শহরের মানচিত্র থেকে অদৃশ্য হয়ে গেছে। এভাবে লাগামহীনভাবে ভরাট কার্যক্রম চলতে থাকলে অদুর ভবিষ্যতে শহরটির মানচিত্র হবে পুকুর শূন্য।

ইতোমধ্যেই ভরাট করা হয়েছে র্কোট রোডের একটি জলাশয়। ছবিটি কিছুদিন আগের তোলা।

গত জুলাই মাসে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার পাঁচ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর আলী আহসান কাওসারের নেতৃত্বে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তুলে মধ্যপাড়া বর্ডার বাজার পুকুরটির একাংশ ভরাট করে ফেলা হয়। এর আগে তিনি পুকুরের কিনারে একটি টিনশেড ঘর তুলে তার অফিসঘর নির্মাণ করেন।  এই নিয়ে এলাকার ডঃআবু সাঈদ, মাহবুব আলম,ছাদেক মিয়া,পারভেজ  সহ  অনেকেই বিভিন্ন সময়ে পরিবেশ অধিদপ্তরে অভিযোগ জানালে জেলা প্রশাসন ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে পুকুরের মালিক পক্ষের জনৈক শাহজাহানকে দুই লাখ টাকা জরিমানা করেন এবং ভরাটকৃত বালু তিনদিনের মধ্যে অপসারণের নির্দেশ দেন।এদিকে কোর্ট রোডের পুকুর ভরাটের বিষয়ে পরিবেশ অধিদপ্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে এনফোর্সমেন্ট মামলা ৭৯৫/২০১৯ এর পরিচালক মো. আজাদুর রহমান মল্লিক বিবাদী পক্ষের সমস্ত দলিল দস্তাবেজ যাচাই করে এক আদেশে কোর্ট রোডের পুকুর ভরাটের অভিযোগ থেকে মালিকপক্ষকে অব্যাহতি প্রদান করা হয়। যদিও বিগত দিনে এই পুকুর ভরাটের বিষয়ে নানা মাধ্যমে প্রতিবাদ লক্ষ্য করা গেছে।  ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের হিসাব অনুযায়ী, মহকুমা শহর আমলে পৌর এলাকার ২২টি মৌজায় প্রায় দুই শতাধিক পুকুর ছিল। তবে সেই সংখ্যা এখন মাত্র ৪৭।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া পরিবেশ অধিদফতরের গবেষণা কর্মকর্তা মোঃ রুনায়েত আমিন রেজা বলেন, তাদের পরিবেশ অধিদপ্তর গত ২০১১ সালে এই জেলায় কার্যক্রম শুরু করে। গত আট বছরে তারা পুকুর ভরাটকারিদের বিরুদ্ধে মোট ১৩ টি মামলা দায়ের করেছে এবং বিপুল সংখ্যক পুকুর মালিককে আর্থিক জরিমানা করেছেন। তবুও পুকুর ভরাট প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না, আক্ষেপের সুরে জানালেন এই কর্মকর্তা।  তিনি আরও বলেন, কার্যত পুকুর ভরাট বন্ধ হচ্ছে না কারণ বিভিন্ন সময় ক্ষমতাসীন দলের লোকেরা আর্থিক ফায়দা নেয়ার স্বার্থে পরোক্ষভাবে জলাশয় ভরাটকে সমর্থন দিয়ে গেছেন এবং যাচ্ছেন। এই ধারা অব্যাহত থাকলে একদিন শহরে হয়তো একটিও পুকুর থাকবে না।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিসের উপ-পরিচালক তানহারুল ইসলাম বলেন, আগে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা অগ্নিকান্ডের ঘটনাস্থল সংলগ্ন পুকুর থেকে পানি নিয়ে আগুন নেভানোর কাজে লাগাতেন। কিন্তু এখন আগুন নেভাতে তাদেরকে চরম সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রশাসক হায়াত-উদ-দৌলা খান সাংবাদিকদের বলেন, কোন পুকুর ভরাটের তথ্য পেলে পরিবেশ অধিদপ্তর মামলা করে। আমরাও কোন সংবাদ পেলে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করি। পুকুর ভরাটের বিষয়ে আমরা খুবই সজাগ আছি। ইতোমধ্যে শহরের বর্ডার বাজার ও উত্তর পৈরতলায় দুটি পুকুর ভরাট বন্ধ করেছি। তবে এ ক্ষেত্রে জনগণকেও এগিয়ে আসতে হবে বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসক।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array