আশরাফুল মামুন; ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিজয়নগর উপজেলার ইউএনও ২য় বারের মত করোনা পজিটিভ হয়েছেন। বিভিন্ন পরিবর্তিত পরিস্থিতি মোকাবেলার অভিজ্ঞতা শেয়ার করে অফিসিয়াল ফেইসবুক পেইজে একটি আবেগঘন স্ট্যাটাস দিয়েছেন। একজন নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে জন দোরগোড়ায় সরকারি সেবা পৌঁছে দিতে কিভাবে চ্যালেঞ্জ নিয়ে অর্পিত দায়িত্ব পালন করেছেন সেটা সরল ভাষায় প্রকাশ করেছেন। তার এই স্ট্যাটাস টি নিম্নে হুবহু তুলে ধরা হলো…..
২০২১ সালের ঈদুল আযহার সময়ে একটানা ০৭ দিন ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশন এর অধীন গরুর হাটগুলোতে আইন শৃংখলা রক্ষা ও স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার স্বার্থে দায়িত্ব পালন করি ও মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করি। সরকারি দায়িত্ব পালনের স্বার্থে লাখ লাখ মানুষের সংস্পর্শে আসতে হয়। ঈদের কিছুদিন পর তীব্র জ্বরে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হই। হাসপাতালে ভর্তির জন্য গেলে জানা যায় করোনা ভাইরাসে সংক্রমিত হয়েছি। প্রায় ১৫ দিন লড়াই করে সুস্থ হয়ে উঠলে কিছুদিন রেস্টের পর পুনরায় কাজে যোগ দেই। ডাক্তার বলেছিল শারীরিক অবস্থা খুবই নাজুক তাই অন্তত ১ মাস ডেস্কে বসে কাজ করতে এবং বাইরে না যেতে। এই অবস্থায় ৫/৬ দিনের মাথায় বিজয়নগর উপজেলায় ইউএনও হিসেবে যোগদান করি। উপজেলা নির্বাহী অফিসার হিসেবে বিশ্রাম এক অলীক কল্পনা। যোগদানের পর থেকেই সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন, সকল সভা ও দিবস উদযাপন, গৃহহীন পরিবারের ঘর নির্মাণ কাজের তদারকি, খাস জমি উদ্ধার, মোবাইল কোর্ট পরিচালনা, বীর নিবাসের উপকারভোগী নির্ধারণের জন্য প্রতিটি বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিবার যাচাই বাছাই করা, মহান বিজয় দিবস উদযাপন, সকল উপজেলায় নির্বাচনে ম্যাজিস্টেট হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং সর্বশেষ বিজয়নগর উপজেলার ১০ টি ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনসহ এই দাপ্তরিক কর্মযজ্ঞে সপ্তাহের প্রতিটি দিন কাজ করতে হয়েছে। বিজয়নগরে যোগদানের পর একদিনও ছুটি কাটানোর সুযোগ পাইনি। এমনকি কোনো শুক্র শনিবার সারাদিন বাসায় থাকতে পেরেছি বলেও মনে পড়ে না। কখনো কখনো রাত ১০ টা পর্যন্ত অফিসেই থেকেছি। কাজ ফাঁকি দেয়ার কথা কখনো মাথায় আসে নি। কারণ নিজে পছন্দ করেই এই পেশায় এসেছিলাম মানুষের জন্য কাজ করতে। চেষ্টা করেছি। চেষ্টা করছি সেই ওয়াদা পূরণ করার। আমার অফিস রুমের দরজা সবার জন্য উন্মুক্ত ছিলো এবং থাকবে। কতো কতো দিন বিকেল ৪ টায় দুপুরের খাবার খেয়েছি হিসেব করা যাবে না। অফিসে যারা বিভিন্ন কাজে আসতেন প্রায়ই বলতেন, আপনি এভাবে খাওয়া নিয়ে অনিয়ম করলে অসুস্থ হয়ে পড়বেন। আমি উনাদের বিদায় করে পুনরায় কাজে মনোযোগী হতাম। হাতের কাজ শেষ না করে উঠতে পারি না। মন সায় দেয় না।
এই সময়ের মধ্যে আমি কখনো স্বাস্থ্যবিধি অবহেলা করেছি বলে মনে পড়ে না। অফিসেও সার্বক্ষণিক মাস্ক পরিধান করেছি। হ্যান্ড স্যানিটাইজার ব্যবহার করেছি। এমনকি খুব কম ছবিতেই আমাকে হয়তো মাস্ক ছাড়া দেখা যাবে। খুব করে চাইতাম যেন আবার আক্রান্ত না হই। আক্রান্ত হওয়া মানেই আড়ালে চলে যেতে হবে। যেই কাজের দায়িত্ব নিয়ে উপজেলায় এসেছিলাম, মানুষের সেবা করার জন্য যেই উদ্যোগ নিয়েছিলাম তা ব্যাহত হবে। তাই নিজের সুস্থতার দিকে খেয়াল ছিলো।
কিন্তু ভাগ্যের লিখন না যায় খণ্ডন। গত ৪/৫ দিন ধরেই শারীরিকভাবে কিছুটা খারাপ লাগছিলো। কাশি, মাঝে মাঝে হাঁচি ও জ্বর নিয়েই কাটাচ্ছিলাম। এর মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (PIO) এর কোভিড-১৯ সনাক্ত হয়। উপ সহকারী প্রকৌশলী, জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল এরও পজিটিভ। গেলো কিছুদিনের কাশি ও জ্বর না কমায় আজকে টেস্ট করালে আমারও কোভিড – ১৯ পজিটিভ আসে। গত ৬ মাসের মধ্যে দ্বিতীয়বার কোভিড – ১৯ পজিটিভ হলাম।
এখনো পর্যন্ত কোনো তীব্র লক্ষণ নেই তবে আইসোলেশনে আছি। জানি না পুনরায় কবে আবার আপনাদের মাঝে ফিরতে পারবো। তবে খুব দ্রুতই ফিরতে চাই নিজের কাজে। অল্প দিনেই ভালোবেসে ফেলা এই জনপদকে নিয়ে দেখা অনেক স্বপ্ন যে এখনো বাস্তবায়ন করা বাকি।
সবার কাছে দোয়ার প্রার্থনা করছি। দোয়া করবেন যেন পুনরায় আবার আগের মত উদ্যমী হয়ে আপনাদের মাঝে ফিরে আসতে পারি। আর যেভাবে করোনা ভাইরাসের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে তাতে সবাইকে বিনীত অনুরোধ করছি স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলতে। করোনার লক্ষণ বুঝতে পারলে দ্রুত পরীক্ষা করান। কারণ আপনার অজান্তেই হয়তো আপনার দ্বারা আপনার প্রিয় মানুষটার অনেক বড় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।
তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।
ArrayCopyright © 2026 তেপান্তর | Design & Developed By: ZamZam Graphics