Tepantor

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বহুতল ভবন: পৌরসভার নীরবতায় বেআইনি সাম্রাজ্য

8 November, 2025 : 11:17 am
????????????????????????????????????

তেপান্তর রিপোর্ট:

ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে ৬ তলার উপরে ভবন নির্মাণে নিষেধাজ্ঞা থাকলেও, সেই নিয়মের তোয়াক্কা না করে দেদারছে গড়ে উঠছে ৭ থেকে ১৪ তলা পর্যন্ত বহুতল ভবন। শহরের বিভিন্ন এলাকায় এখন চলছে অবৈধ ভবন নির্মাণের প্রতিযোগিতা, আর সব কিছু ঘটছে পৌরসভার নাকের ডগায়।
৬ তলা পর্যন্ত অনুমোদন নিয়ে নির্মাণ করা হচ্ছে আরও কয়েক তলা বাড়তি ভবন। আবার অনেক ভবন মালিক একেবারেই কোনো অনুমোদন ছাড়াই বিশাল ভবন দাঁড় করাচ্ছেন ও করিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী ৬ তলার বেশি অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার পৌরসভার নেই। কিন্তু অভিযোগ আছে, বিশেষ সুবিধার বিনিময়ে পৌরসভার কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা ভবন মালিকদের গোপনে পরামর্শ দেন অনুমোদন ছাড়াই ভবন নির্মাণের। ফলে নির্মাণ চলাকালেও পৌরসভা থাকে সম্পূর্ণ নিরব।
দেড় যুগেরও বেশি সময় ধরে শহরে এভাবেই চলছে অবৈধ ভবন নির্মাণ, অথচ কোনো সময়েই পৌরসভা কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি। পরিবর্তন হয়েছে মেয়র, বদলেছে রাজনৈতিক দল, কিন্তু অবৈধ নির্মাণ বন্ধ হয়নি।
যখন যে দল ক্ষমতায় থেকেছে, সেই দলের মেয়র বা চেয়ারম্যানই এসব অনিয়মে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন। মিডিয়ার সামনে তারা সবসময় নিজেদের নির্দোষ দাবি করে বলেছেন, এসব ভবন নির্মিত হয়েছে আগের মেয়র বা চেয়ারম্যানের সময়। কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায়, অনুমোদন না থাকলে তারা কেন ভবন মালিকদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নিলেন না?

জনশ্রুতি আছে, এসব অবৈধ বহুতল ভবন নির্মাণে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী কাউসার আহমেদ। স্থানীয়দের অভিযোগ, ভবন মালিক ও মেয়রের মধ্যে যোগাযোগের দালালি মূলত তিনিই করতেন। মেয়র না থাকায় এখন পুরো বিষয়টি তিনিই একাই দেখছেন। আওয়ামীপন্থী এই প্রকৌশলী কয়েক বছর আগে সহকারী প্রকৌশলী থাকাকালীন সময় থেকেই তিনি এই অনিয়মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন বলে দাবি করছেন স্থানীয়রা।

অন্যদিকে, এসব ভবনে নেই কোনো অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থা। ফায়ার সার্ভিস কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, তারা এসব অবৈধ ভবনকে কোনোভাবেই সমর্থন করে না, কারণ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বড় ধরনের বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। এছাড়া ভূমিকম্পের ঝুকিতেও রয়েছে ভবনগুলো।

ব্র্রাহ্মণবাড়িয়া ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়,কোন মফস্বল শহরে ভবন নির্মান করতে হলে নিরাপত্তার দিক বিবেচনায় ভবন মালিককে ফায়ার সার্ভিস হেড কোয়ার্টারে আবেদন করতে হয়। তখন হেড কোয়ার্টার সেই ভবন নির্মানে অগ্নিনির্বাপন ব্যাবস্থা ঠিক রাখছে কিনা সেটা যাচাইয়ের জন্য দায়ীত্ব দেয় সেই জেলা শহরের ফায়ার সাভির্সকে। তখন সংশ্লিষ্ট ফায়ার সার্ভিস সব যাচাই বাচাই করার পর সঠিক মনে করলে হেড কোয়ার্টারকে জানাবে তারপর হেড কোয়ার্টার ফায়ার সার্ভিস আইনে সেই ভবনকে অনুমোদন দেবে।
কিন্তু ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বহুতল ভবনগুলো এই আইন ভঙ্গ করেই নির্মান করা হচ্ছে।
সূত্র আরো জানায়,ভবন নির্মানে অগ্নিনির্বাপনের যে ব্যাবস্থা গুলো রাখতে হয় তা হলঃ-১-নিজস্ব পানির পাম্প,২-স্থায়ী অগ্নি নির্বাপন ব্যাবস্থা,৩-ছাদের উপরে রিজার্ভার,৪-সিড়ির প্রসস্ত নূন্যতম দেড় মিটার,৫-বিকল্প সিড়ি,৬-অগ্নিনির্বাপনের জন্য জেনারেটর,৭-সিড়ির নিচে বিকল্প বাতি,৮-ভবনের সাথে ৩০-ফিট প্রসস্ত রাস্তা,৯-ভবনের পাশে বৈদ্যুতিক খাম্বা ও তার থাকতে পারবেনা,১০-বিল্ডিংয়ের নিচে পানির ট্যাঙ্ক থাকতে হবে।

১৩ বছর পিছনে তাকানো যাক:

২০১২ সাল। তখন পৌরসভার মেয়র আওয়ামীলীগ নেতা হেলাল উদ্দিন। তার কাছে জানতে চাইলে তিনি এর কোনো সদোত্তর দিতে পারেন নি। তখন তিনি আগের চেয়ারম্যানের উপর দোষ চাপান। অর্থাৎ, বিএনপি’র হাফিজুর রহমান মোল্লা কচি’র কথা বলেছিলেন তিনি। হেলাল উদ্দিনের কথায়, এসব বহুতল ভবনের অনুমোদন দিয়েছিলেন কচি।

২০১৪ সালে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরে বহুতল ভবন ও অনুমোদনহীন ভবনের সংখ্যা কত এব্যাপারে জানতে চাওয়া হয়েছিল ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার তখনকার সহকারি প্রকৌশলী ও বর্তমানে এই পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী কাওসার আহমেদের কাছে। তিনি প্রতিবেদককে বলেছিলেন, ১ সপ্তাহ পর দেখা করলে অনুমোদনহীন ও বহুতল ভবনের তালিকা দিতে পারবেন। কিন্তু তার কথামত ১ সপ্তাহ পর দেখা করলে তিনি তালিকা দেন নি। এ ব্যপারে বর্তমানেও অনীহা আছে তার।

ওই সময় হালদার পাড়ার ১৩ তলা ভবন এলআর টাওয়ারের দায়ীত্বে থাকা মোঃ মুরসালিন তখন জানিয়েছিলেন,তাদের ভবন অনুমোদন নিয়েই তৈরি করা হয়েছে। কাগজ দেখতে চাইলে তিনি জানান,পৌরসভার সার্ভেয়ার মোঃ মতির কাছে সব আছে। দেখা করলে মোঃ মতি বলেছিলেন,আমার কাছে এগুলোর কাগজ পত্র থাকার প্রশ্নই উঠেনা।আমি সার্ভেয়ার,জায়গা জামির কাগজ পত্র আমার কাছে থাকে।

এদিকে কে দাস মোড়ের কে দাস মার্কেটের মালিক ছানাউল হক। মার্কেটের তখনকার কেয়ারটেকার কামালউদ্দিন জানিয়েছিলেন, তিনি একটি জাতীয় ইংলিশ পত্রিকার সম্পাদনা বিভাগের দায়ীত্বে থাকায় তার প্রচুর প্রভাব। উক্ত মার্কেটের দায়ীত্বে থাকা কামাল উদ্দিন বলেছিলেন,তারেক জিয়া ছোট বেলায় এখানে খেলাধুলা করেছিল,তাই এই ভবন নির্মানে কোন অনুমোদন লাগেনি।
এবিষয়ে ব্রাহ্মণবাড়িয়া পৌরসভার ২০১৪ সালের দায়ীত্বে থাকা নিবার্হী প্রকৌশলি জেড এম আনোয়ার প্রথমে কিছু জানেনা বললেও পরে ৬ তলার উপরে সব ভবন অবৈধ বলে স্বীকার করেছিলেন।

তখনকার মেয়র মোঃ হেলাল উদ্দিন প্রতিবেদক’কে বলেছিলেন,৬ তলা নয় আমরা ১০ তলা পর্যন্ত অনুমোদন দেওয়ার অধিকার রাখি। অবশ্য তার এ কথার পক্ষে তিনি তখন কোনো কাগজ পত্র দেখাতে পারেননি।

তারপর ২০১৬ সাল।
তখন মেয়র মিসেস নায়ার কাবির। তিনি এক কথায় প্রতিবেদক’কে জনিয়ে দিলেন এগুলো তিনি অনুমোদন দেননি, দিয়েছেন আগের মেয়র হেলাল উদ্দিন।

এবিষয়ে পৌরসভার নিবার্হী প্রকৌশলি কাউসার আহমেদ বলেছেন, এসব বিষয় দেখা পৌরসভার দায়িত্ব নয়।

লো ব্রাহ্মণাবাড়িয়া পৌরসভার বিল্ডিং কোড বাস্তবায়নের চিত্র।

Tepantor

তেপান্তরে প্রকাশিত/প্রচারিত কোনো সংবাদ, তথ্য, ছবি, আলোকচিত্র, রেখাচিত্র, ভিডিওচিত্র, অডিও কনটেন্ট কপিরাইট আইনে পূর্বানুমতি ছাড়া ব্যবহার করা যাবে না।

Array